সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

আজ বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ভবনে নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের নয়। সড়ক পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, পরিবহনমালিক, শ্রমিক, চালক, যাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

সড়কে মানুষের প্রাণহানি রোধে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, এ ক্ষেত্রে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা কেউ কারও প্রতিপক্ষ নই। এখানে যাঁরা আছি, সবারই দায়িত্ব হচ্ছে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা।” এই লক্ষ্য অর্জনে পারস্পরিক সহযোগিতা, নিয়মিত আলোচনা এবং সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রতিদিনই সড়কে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তবে সব ধরনের যানবাহন দুর্ঘটনা কিংবা সড়ক-সংশ্লিষ্ট প্রাণহানিকে একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। দুর্ঘটনার প্রকৃতি, কারণ ও পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ৩১ হাজার মানুষের মৃত্যুর একটি জরিপভিত্তিক তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের পরিসংখ্যানের উৎস, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দক্ষতা ও সম্পৃক্ততা যাচাই করা প্রয়োজন। তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত না করে সড়ক নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “জাতিকে ভুল তথ্যের মধ্যে রেখেও যেমন সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, ঠিক একইভাবে প্রকৃত তথ্য না জানলেও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।” তাই দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের করণীয় সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সড়কে প্রাণহানি কমবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কার্যকর সুপারিশ দিলে সরকার তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমিয়ে আনা।

চালকদের আচরণ, দক্ষতা ও যানবাহনের ফিটনেসের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকদের সচেতনতা ও দক্ষতার বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। একই সঙ্গে যানবাহনের উপযুক্ত ফিটনেস নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে শুধু চালকদের দায়ী করে কিংবা শুধু যানবাহনের ত্রুটিকে সামনে এনে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান করা যাবে না। দুর্ঘটনার পেছনে থাকা বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বলে তিনি জানান।

মন্ত্রী আরও বলেন, সড়কে নিরাপদে যানবাহন চালানোর জন্য দক্ষ ও যোগ্য চালক প্রয়োজন। চালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যানবাহনের মালিকদেরও ফিটনেস ও নিরাপদ পরিচালনার বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।

পরিবহন খাতের পরিবর্তন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এ খাতের সঙ্গে যুক্ত অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সংগঠন পরিবর্তন চায়। তারাও চায় না যে অনিরাপদ পরিবহনব্যবস্থার কারণে সড়কে মানুষের প্রাণহানি ঘটুক। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে রাতারাতি পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। তাই বলে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমরা নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেকোনো মূল্যে করতে চাই।” এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ, পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলোর বাস্তবায়ন চলছে। সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলে এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে সফল হতে হবে। সে জন্য পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিস্তার এবং সড়কে এর প্রভাবের বিষয়েও বক্তব্য দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে যান চলাচলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তবে এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিজেদের আচরণ নিয়েও ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। অটোরিকশার চলাচল নিয়ে সমালোচনা করলেও মানুষ নিজেরা এসব যানবাহনে চলাচল বন্ধ করেছেন কি না, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সমস্যার সমাধানে শুধু অন্যের ওপর দায় চাপালে হবে না; প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকেও দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে হলে চালক, মালিক, শ্রমিক, যাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবার আচরণে দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন থাকতে হবে। সড়ক ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলা, যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, শ্রম মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিবহননেতা অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানসহ সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।