২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের ব্যাপারে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি উল্লেখ করেন, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হেলমেটের মান উন্নয়ন ও হালনাগাদ করা, গতিসীমা কঠোরভাবে কার্যকর করা, দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও কার্যকর জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মহাসড়কগুলোতে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণসহ বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে 'জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬' উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির capacity-তে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রাম এবং রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ যৌথভাবে ‘বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক এই বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে শেখ রবিউল আলম বলেন, “সরকার, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করা যাচ্ছে না।” তিনি আরও বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা কেবল নির্দিষ্ট কোনো দিবসে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর ধরে অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

মন্ত্রী আরও জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে বলে তিনি আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, দেশের বর্তমান সড়ক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। তিনি উল্লেখ করেন, অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এবং এর ফলে একে অপরের প্রতি দোষারোপের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী সড়ক পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে এই খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়া জরুরি। পরিবহন মালিক, শ্রমিক, পুলিশ এবং সাংবাদিকেরা যদি একযোগে কাজ করেন, তবে দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক তার বক্তব্যে জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি প্রকল্পে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং তাদের বেতন-ভাতার বিষয়েও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন। পরবর্তীতে একই কর্মসূচির ব্যবস্থাপক এম খালিদ মাহমুদ বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি, সরকারের গৃহীত অঙ্গীকার এবং সাম্প্রতিক অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

গোলটেবিল বৈঠকে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহত মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচনায় নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ, গতিসীমা কার্যকর করা, যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নের বিষয়গুলো উঠে আসে।

বৈঠকে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা বা ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এই পদ্ধতির মূল কথা হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল সড়ক ব্যবহারকারীদের নয়; বরং নীতিনির্ধারক, সড়ক কর্তৃপক্ষ, পরিবহন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্বাস্থ্য খাতসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এই বৈঠকে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী এবং রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশের সদস্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।