মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের একটি নিয়মিত আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতি মাসে উঠে আসে অদম্য মেধাবীদের জীবনসংগ্রামের গল্প। আর্থিক অনটন, পারিবারিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক প্রতিকূলতাকে জয় করে এই মেধাবীরা যেভাবে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন, তা অনেকের জন্য কঠিন সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি এই আয়োজনে উঠে এসেছে রংপুর জেলার বদরগঞ্জের এক অদম্য মেধাবী মোছা. মমিনা খাতুনের জীবনযুদ্ধের কাহিনী। তিনি ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। মমিনা খাতুন ব্র্যাক ব্যাংক-মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে এইচএসসি এবং স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন। গত ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ‘অদম্য মেধাবীর সঙ্গে’ অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা এবং সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতে মমিনার ছোটবেলার কথা জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তিনি অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পড়াশোনা করেছেন। সেখানে মেয়েদের কথা তো ছেড়েই, ছেলেদের মধ্যেও স্নাতক শেষ করার মতো তেমন কেউ ছিল না। তবে অষ্টম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে চেষ্টা করলে আরও ভালো করা সম্ভব, আর নবম শ্রেণিতে তিনি প্রথম হয়েই সেই আত্মবিশ্বাস পান। সেই সময়ে তাঁর এলাকায় উচ্চশিক্ষার ধারণা বলতে কেবল ডাক্তার হওয়াকেই গণ্য করা হতো; বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। তাই ছোটবেলায় তাঁর স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়া।
গ্রাম থেকে শহরে এসে পড়াশোনার যাত্রায় পারিবারিক ও সামাজিক বাধার কথা উল্লেখ করে মমিনা বলেন, “আমার বাবা-মা সরাসরি বাধা না দিলেও পারিপার্শ্বিক চাপ ছিল প্রচুর। ভালো রেজাল্ট করার পরেও কথা শুনতে হয়েছে—‘মেয়ে পড়াশোনা করে কী করবে, অন্য বাড়িতে তো চলেই যাবে?’ প্রতিবেশি অন্যান্য আত্মীয়রাও বলত এসএসসির বেশি পড়াশোনার দরকার নেই, বিয়ে দিয়ে দিতে হবে।” তিনি আরও জানান, সমাজে এখনো ছেলেদের পড়াশোনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং মেয়েদের পিছিয়ে দেওয়ার মানসিকতা কাজ করে। তবে তাঁর বাবা কিছুটা সন্দিহান থাকলেও মমিনার যুক্তির ওপর ভরসা রেখেছিলেন।
মুক্তকণ্ঠের শিক্ষাবৃত্তির প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, “এসএসসিতে ভালো রেজাল্টের পর মুক্তকণ্ঠের অঞ্চল প্রতিনিধির মাধ্যমে আমি মুক্তকণ্ঠের শিক্ষাবৃত্তির সহযোগিতা পাই। এই বৃত্তি না পেলে হয়তো আমার পড়াশোনা ওখানেই থেমে যেত।” শহরের সরকারি কলেজে ভর্তির পর আর্থিক সংকটে প্রথম ছয় মাস তিনি কোনো প্রাইভেট পড়তে পারেননি। পরবর্তীতে মুক্তকণ্ঠের প্রতিনিধির সহায়তায় একটি টিউশন জোগাড় করেন, যা তাঁর পড়াশোনার খরচ মেটাতে এবং শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করতে বড় ভূমিকা রাখে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, মেডিকেলে সুযোগ না পেয়ে তিনি প্রথমে ভেঙে পড়েছিলেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে কৃষিতে সুযোগ পান। প্রথম সেমিস্টারে ফলাফল খারাপ হলেও নিজের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং মানসিক শান্তির জন্য তিনি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন। শেষ পর্যন্ত ৩.৭৭ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করেন তিনি।
মিনার এই সাফল্যে তাঁর বাবা-মায়ের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার বাবা-মা এখন অনেক বেশি খুশি। একসময় যারা নানা কথা বলতো, তারাই এখন বলে—‘অমুকের মেয়ে তো প্রশাসনের ক্যাডার হয়েছে।’ বাবা এখন অনেক গর্ব করে জানান যে এলাকার সবাই এখন তাঁকে চেনেন।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তাঁর এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের জন্য কিছু করার তীব্র ইচ্ছা তাঁর আছে। তিনি বলেন, “অবশ্যই ইচ্ছা আছে। আমাদের এলাকায় মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাপোর্ট দেওয়া হয় না—এই ভুল ধারণা ও ব্যবধান আমি ভাঙতে চাই। এলাকার পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েরা সুযোগ পেলে অনেকদূর এগিয়ে আসবে।” এই লক্ষ্যে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে যা তিনি সময়মতো বাস্তবায়ন করবেন।
দীর্ঘ লড়াইয়ে মনোবল ধরে রাখার বিষয়ে তিনি জানান, তিনি বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিতেন। ছোট লক্ষ্যগুলো পূরণ হলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেত। এছাড়া মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের অনুপ্রেরণা তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বলা হতো—“আরেকটু সামনে... আরেকটু সামনে গেলে হয়তো তোমার সফলতা আসবে।”
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মমিনা বলেন, “শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবনে যাঁরা অবদান রেখেছেন—আমার স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ, মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্ট, ব্র্যাক ব্যাংক ও আরও যাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছেন—সবার প্রতি আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় আজ আমি এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি।”
সাক্ষাৎকারের শেষে তাঁর জন্য শুভকামনা জানানো হলে তিনি বলেন, “আপনাদেরকেও ধন্যবাদ আমার পাশে থাকার জন্য। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমি সৎ থেকে আমার পেশাগত দায়িত্ব সুনামের সহিত পালন করতে পারি।”