৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রার্থীদের নাম পুনরায় সংযুক্ত করে নতুন করে গেজেট প্রকাশের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন বঞ্চিত প্রার্থীরা। তাঁদের এই দাবির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এই আন্দোলনের তীব্রতা বাড়িয়ে মোহাম্মদ হাবিবুল ইসলাম নামের একজন প্রার্থী আমরণ অনশন শুরু করেছেন।

আজ বুধবার বেলা সাড়ে তিনটে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এই কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা।

আমরণ অনশনে বসা মোহাম্মদ হাবিবুল ইসলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তিনি ৪৫তম বিসিএসের কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তবে গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত গেজেটে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। হাবিবুল ইসলামের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বা কোনো ধরনের ফৌজদারি মামলা নেই, তা সত্ত্বেও তাঁকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় তাঁর দীর্ঘ চার বছরের কঠোর পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। হাবিবুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বঞ্চনার শিকার হয়েছি।’

নিজের নাগরিক অধিকার এবং গেজেট থেকে বাদ পড়ার প্রকৃত কারণ জানতে চেয়ে হাবিবুল ইসলাম বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে আমার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে সরকার আমাকে বঞ্চিত করেছে। আমার জানামতে, আমি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নই এবং কোনো ফৌজদারি মামলার আসামিও নই। তাহলে রাষ্ট্র আমাকে কেন গেজেট থেকে বাদ দিল, সেই কারণ জানতে চাই।’

সরকারের পূর্ব ঘোষণা এবং গেজেট প্রকাশের সিদ্ধান্তের মধ্যে যে অসংগতি রয়েছে, তা তুলে ধরে হাবিবুল ইসলাম উল্লেখ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১ অক্টোবর ঘোষণা দিয়েছিলেন যে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা করা হবে না। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁদের অনেকেই গেজেটে স্থান পাননি। কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তা সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

হাবিবুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সরকারের একটি সিদ্ধান্তের কারণে আমার চার বছরের পরিশ্রম নষ্ট হয়ে গেল। আমি মনে করি, কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমি চাই, সরকার আমার নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিক এবং ন্যায্য অধিকার অনুযায়ী আমাকে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ করে দিক।’

একইভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক সুব্রত তালুকদার, যিনি ৪৫তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেটে নাম পাননি। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের বাসিন্দা সুব্রত তালুকদারের মতে, গেজেটে নাম আসলে তিনি উপজেলা পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুযোগ পেতেন। তাঁর নিজের এলাকার মানুষই স্বাস্থ্যসেবা থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত এবং সেখানে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। কিন্তু সেই এলাকা থেকে উঠে এসেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

গেজেটে নাম না আসায় ব্যক্তিগত জীবনেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে বলে জানান এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবেও তিনি বাড়িতে যেতে পারেননি। উৎসব বাদ দিয়ে তাঁকে ঢাকায় অবস্থান করতে হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে এবং মানববন্ধনে অংশ নিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টের।

স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরেক প্রার্থী মোহাম্মদ ইব্রাহিম সিরাজ বলেন, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। জুলাই আন্দোলনের পর একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা থেকে তাঁরা সরকারের কাছ থেকে মানবিক সিদ্ধান্ত আশা করছেন।

অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন একরাম গাজী হৃদয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। হৃদয়ের দাবি, বঞ্চিত প্রার্থীদের মধ্যে যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নেই, তাঁদের বিষয়ে পুনরায় তদন্ত করে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

একরাম গাজী হৃদয় বলেন, ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না। শুধু অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করে যেন কাউকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া না হয়।’