মাদারীপুর সদর উপজেলায় একটি মসজিদের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এই বিরোধের জেরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শতাধিক বসতবাড়িতে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ফিরে এসে বাসিন্দারা তাদের ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় দেখতে পান। উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের বাহেরান্দী গ্রামে এই ভয়াবহ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই হামলায় শতাধিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সহিংসতায় আহত অন্তত পাঁচজন বর্তমানে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বেশ কিছু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বাচ্চু মোড়লের অনুসারীরাই এই পরিকল্পিত হামলায় জড়িত। ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে বাহেরান্দী জামে মসজিদের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতি হিসেবে মোশারফ ফকিরকে মনোনীত করা হলে আওয়ামী লীগ নেতা বাচ্চু মোড়ল তীব্র আপত্তি জানান। এরপর থেকেই কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলে আসছিল। স্থানীয়দের মতে, এর আগেও দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা কথা-কাটাকাটি এবং ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, বুধবার সকালে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শতাধিক লোক এমদাদ মাতুব্বরের সমর্থকদের বাড়িঘরে অতর্কিত হামলা চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে এই তাণ্ডব ও ভাঙচুর। এই সময়ে মালামাল লুট, অগ্নিসংযোগ এবং ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ উঠেছে। খবর পেয়ে সদর থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরবর্তীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

আক্রান্ত পরিবারের একজন সদস্য শিল্পী আক্তার জানান, তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান এবং তার স্বামী ঢাকায় কর্মরত। অনেক কষ্ট করে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শিল্পী আক্তার বলেন, “আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করি। আমার স্বামী ঢাকায় কাজ করেন। অনেক কষ্ট করে ঘরটা করেছি। এখন ঘরে কিছুই নেই। জিনিসপত্র নিয়ে গেছে, ঘর ভেঙেচুরে দিয়েছে। আমি বাচ্চু মোড়লদের বিচার চাই।”

আলামিন মাতুব্বর, রুবিনা ও মারুফ হোসেনসহ আরও কয়েকজন অভিযোগ করেন, বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে প্রাণভয়ে তারা দ্রুত বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। পরে ফিরে এসে তারা দেখেন তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং মালামাল লুট হয়ে গেছে। তাদের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীদের বাধা দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি।

জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা তামিম মাতুব্বর অভিযোগ করেন, পুলিশ পক্ষপাতমূলক আচরণ করে তাদের বাড়িঘর থেকে সরিয়ে দেয়। এরপরই প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে বলে দাবি তার। তিনি বলেন, “আমি একজন জুলাই যোদ্ধা এবং ছাত্রদলের কর্মী। আমার ঘরও তারা ছাড় দেয়নি। বাচ্চু মোড়ল আওয়ামী লীগের নেতা। আমি জুলাই যোদ্ধা হওয়ার কারণে আমাদের ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, মসজিদের কমিটি নিয়ে বিরোধ ছাড়াও এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা বিস্তারিত তদন্ত করে বের করতে হবে। পাশাপাশি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক নিরূপণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত বাচ্চু মোড়ল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি বা আমাদের সমর্থকরা তাদের ঘরবাড়ি লুটপাট, ভাঙচুর এবং আগুন জ্বালায়নি। তারা নিজেরাই এ কাজ করেছে।”

ঘটনাস্থলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ। তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক। দুই পক্ষকেই শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ আইন অনুযায়ী যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”