ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে বুথফেরত জরিপের প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এই পরিস্থিতির ফলে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং কীভাবে গঠিত হবে নতুন সরকার?
আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট ৫২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৯টি আসন। এছাড়া আরব লিস্ট ১৯টি আসনে জয়ী হয়েছে।
১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৬১টি আসন কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে তীব্র রাজনৈতিক দর–কষাকষির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, নেসেটে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের মার্চের মধ্যে ইসরায়েলি নাগরিকদের তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে হয়েছিল। সেই জটিল পরিস্থিতি সামলাতে নেতানিয়াহু ও তাঁর তৎকালীন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজের মধ্যে একটি ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এদিকে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো এবার অভাবনীয় ফলাফল অর্জন করেছে। এই দলগুলো বর্তমানে কোনো জোটের অংশ নয়। তবে অন্য দলগুলো যদি তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে রাজি হয়, তবে তারা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা ‘কিংমেকার’ ভূমিকা পালন করতে পারে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গাদি আইজেনকট বলেন, “নেতানিয়াহুর প্রতি যে মানুষের ‘আস্থার সংকট’ রয়েছে, সেটা বুথফেরত জরিপে স্পষ্ট হয়ে গেছে।”
বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জোট “শোচনীয় পরাজয়ের” মুখোমুখি হয়েছে। মানুষ তাদের ঘরে ফিরে যেতে বলেছে।
তবে বিরোধীপক্ষের এই দাবিকে ‘আগাম উদ্যাপন’ বলে অভিহিত করেছেন লিকুদ পার্টির রাজনীতিবিদ এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “লিকুদ ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া সব সময়ের জন্যই ভালো।”
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায় ১৯ বছর ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। গত তিন দশকে নানা রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে টিকে আছেন। তবে তিনি চূড়ান্ত বিজয়ী হয়েছেন নাকি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটেছে—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বুধবার জেরুজালেমে নিজ দলের সমর্থকদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “লিকুদ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। আমরা একটি শক্তিশালী নতুন জাতীয় সরকার গড়ব।”
বিশ্লেষকদের মতামত
ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এহাব জাবারিন মনে করেন, বুথফেরত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর জোটের ‘স্পষ্ট দুর্বলতা’ ফুটে উঠেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “নেতানিয়াহু চূড়ান্ত বিজয়ী হয়েছেন কিংবা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটেছে—কোনোটা বলার সময়ই এখনো আসেনি।”
এহাব জাবারিন আরও উল্লেখ করেন, “একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় যদি কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারে, তবে আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।”
প্রেসিডেন্টের ভূমিকা ও প্রক্রিয়া
আগামী ৪ নভেম্বর নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হবে। এরপর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে আলোচনায় বসবেন এবং জানতে চাইবেন যে তাঁরা কাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান।
প্রেসিডেন্ট এমন একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন, যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করবেন। তবে সেই ব্যক্তি যে অবশ্যই নেসেটে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতা হবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বর্তমানে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের দল সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় তাঁদের দুজনকেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সময়সীমা ও শর্তাবলি
প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর মনোনীত নেতা সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাবেন। প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় দেওয়া হবে, তবে প্রেসিডেন্ট চাইলে আরও ১৪ দিন সময় বৃদ্ধি করতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দল নিজেদের নীতিগত দাবি এবং মন্ত্রীর পদ নিয়ে দর–কষাকষি করবে। মনোনীত প্রার্থী সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করবেন।
যদি কোনো প্রার্থী নেসেটে ৬১টি আসন নিয়ে জোট গঠন করতে ব্যর্থ হন, তবে তিনি ছোট দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। এছাড়া পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের শর্তে ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতাও হতে পারে। নতুন সরকারকে শপথ নেওয়ার জন্য পার্লামেন্টে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আস্থা ভোটে জয়ী হতে হবে। কিছু দলের ভোটদানে বিরত থাকার ফলে ৬১টির কম ভোট পেলেও সরকার গঠন সম্ভব হতে পারে।
আলোচনা ব্যর্থ হলে করণীয়
প্রেসিডেন্ট যাঁকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন, তিনি ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট নেসেটের অন্য একজন সদস্যকে নতুন করে সরকার গঠনের সুযোগ দেবেন। তিনিও নিয়ম অনুযায়ী ২৮ দিন সময় পাবেন।
দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। ওই ব্যক্তিকে সরকার গড়তে ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে। এরপরও যদি অচলাবস্থা দূর না হয়, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নেসেট ভেঙে দেওয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দেশ পরিচালনা করবেন।
পূর্ব অভিজ্ঞতা
ইসরায়েলে এর আগেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের মার্চের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে তিনবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে নেতানিয়াহু এবং বেনি গান্টজের মধ্যে একটি ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি হয়, যেখানে তাঁদের পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। তবে বাজেট পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় এক বছর পর সেই জোট সরকার ভেঙে যায়।