বয়স এখন ৮০ ছাড়িয়েছে, শরীর আর আগের মতো সচল নেই। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ৮০ বছর হলেও কার্তিক পরামানিকের দাবি, তাঁর বয়স আরও দুই-তিন বছর বেশি। এক সময়ের হালকা গড়ন এখন ভারী হয়ে গেছে, চোখমুখ ফোলা। দুই বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর মনটাও ভেঙে পড়েছে তাঁর। আগের মতো দ্রুত হাঁটতে পারেন না তিনি, এমনকি কৃষিকাজও ছেড়ে দিয়েছেন। তবে প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমেনি। বাড়ির পাশের নার্সারিতে চারা তৈরি ও পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর নার্সারিতে বট, পাকুড়, মেহগনি ও শিমুলের শতাধিক চারা রয়েছে, যা তিনি গাছ লাগানোর উপযুক্ত মৌসুমে রোপণ করেন।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের শ্যামপুর-ডাকনিপাড়া সড়কে গাছ লাগানোর কাজ করেন কার্তিক। বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ৬০টি মেহগনি গাছ লাগানো হয়েছে। প্রতিটি চারার পাশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে তা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং গাছে পানি দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগ সম্পর্কে কার্তিক পরামানিক বলেন, ‘এর আগে শ্রমিক পাইনি, তাই ছোট ছেলে সনাতনকে নিয়ে দুজনে মিলে দুই দিনে রামনাথ পাড়ার সড়কে ৩০টি গাছ লাগিয়েছি। আজ ৬০টি গাছ লাগালাম। এবার মোট ২০০ গাছ লাগাব।’
গত ১১ অক্টোবর দুপুরে শিবগঞ্জের তারাপুর ঠুটাপাড়ার কয়েক কিলোমিটার দূরে মাধনগর সড়কে গাছ লাগাচ্ছিলেন কার্তিক ও তাঁর ছোট ছেলে সনাতন প্রামানিক। ছোটবেলা থেকেই সনাতন তাঁর বাবার সঙ্গে গাছ লাগানোর কাজে যুক্ত। তিনি জানান, দুই বছর আগে মা গীতা রানী প্রামানিক মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েন। শরীরও শক্তি হারাতে থাকে এবং মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সনাতন সেদিন বলেছিলেন, ‘বাবাকে বলেছিলাম, তোমার আর গাছ লাগানোর দরকার নেই, তোমার হয়ে আমিই লাগাব। কিন্তু তিনি শোনেননি। গাছ লাগানো তাঁর নেশা। এটা তিনি ছাড়তে পারবেন না।’
কার্তিকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি প্রতিবারই বাড়ির কাছে শ্যামপুর গ্রামের মোড়ে একটি পাকুড় গাছের কাছে নিয়ে যান। ১০ বছর বয়সে তিনি প্রথম এই গাছটি লাগিয়েছিলেন। বিশাল এক ছায়াবৃক্ষ হয়ে গাছটি এখন তাঁর প্রথম কীর্তির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং এর ছায়াতেই চলে সব গল্প।
পুরানো স্মৃতিচারণ করে কার্তিক জানান, একসময় এই পুরো এলাকা ছিল ধু ধু বালুচরে ভরা। সামান্য বাতাস বইলেই চোখমুখ বালুতে ভরে যেত এবং তপ্ত রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটা অসম্ভব ছিল। ছোটবেলায় বাবার বলা একটি কথা তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তাঁর বাবা বলেছিলেন, গয়া-কাশী তীর্থে গিয়ে যে পুণ্য হবে, তার চেয়ে বেশি পুণ্য হবে পথের পাশে ছায়াবৃক্ষ লাগালে; কারণ এতে মানুষ ও পাখপাখালি উভয়েই প্রার্থনা করবে। কার্তিক বলেন, ‘সেই কথা শুনেই আমি গাছ লাগাতে শুরু করি। ঝড়-বাতাস উঠলে দৌড়ে গাছের কাছে চলে আসতাম, জড়িয়ে ধরে থাকতাম, যেন ভেঙে না পড়ে। ধু ধু বালুচর এখন সবুজে ছেয়ে গেছে।’
গাছ লাগানোর এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টার ফলে এলাকায় একটি পাকা সড়কও পেয়েছেন কার্তিক। ২০০৩ সালের ২ ডিসেম্বর মুক্তকণ্ঠে তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার ফলে তাঁর কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৭ সালে তাঁকে কৃষি পদক প্রদান করা হয় ঢাকায়। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন যোগাযোগ উপদেষ্টা। কার্তিকের চাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কিছু চান না; তবে মনাকষা থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত সাত-আট কিলোমিটার কাঁচা সড়কটি পাকা করে দিলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে। সেই বছরই সড়কটি পাকা করা হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে তাঁর জীবন নিয়ে একটি গল্প ছাপা হয়।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে কার্তিক পরামানিক বলেন, ‘এই জীবনে আর কী চাই! যত দিন শরীর চলে, গাছ লাগিয়ে যাব। ছোট ছেলেকে বলে রেখেছি, আমার মৃত্যুর পর তুমি গাছ লাগিয়ে যাবে।’