হাতুড়ি পেটানোর টুং-টাং শব্দ আর তপ্ত লোহার লালচে আভা—এটাই চিত্তরঞ্জন কর্মকারের প্রতিদিন সকালের দৃশ্য। তবে তার জীবনের গল্পটা শুধু লোহা পিটিয়ে দা-বটি বানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রীতি, ভালোবাসা আর হাজারো মানুষের বুকে জমে থাকা এক গভীর সম্প্রীতির গল্প।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একদম কোলঘেঁষা গ্রাম পিরোজপুর। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের অন্যতম এটি। সাড়ে সাত শতাধিক পরিবারের এই জনপদে মানুষের কোলাহল কম নয়। তবে বিশাল এই গ্রামে বাস করে একটিমাত্র হিন্দু পরিবার। ৬ সদস্যের এই ছোট্ট পরিবারের মূল কান্ডারী দুই ভাই শ্রী খোকা কর্মকারের ছেলে শ্রী চিত্তরঞ্জন কর্মকার ও নিরঞ্জন কর্মকার। ছয় মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর চিত্তরঞ্জন এখন স্ত্রীসহ থাকেন। আর নিরঞ্জন কর্মকারের দুই সন্তানসহ পরিবারটিতে সদস্যসংখ্যা মোট ৪ জন।
পরিবারটি মুক্তকণ্ঠকে জানায়, গ্রামটি যখন প্রথম গড়ে উঠেছিল, তখন থেকেই চিত্তরঞ্জনদের পূর্বপুরুষরা এই ভিটায় বসবাস করছেন। ফলে বংশপরম্পরায় এখানকার মুসলিম পরিবারগুলোর সঙ্গে গড়ে উঠেছে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর এক আত্মিক টান। পেশায় কর্মকার হলেও দুই ভাই মাঝেমধ্যে জমিতে চাষবাসের কাজও করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী তারা। সীমান্তঘেঁষা পিরোজপুর গ্রামে ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘সংখ্যাগুরু’ শব্দ দুটি কখনো স্থান পায়নি। নেই ধর্ম বা জাতের কোনো ভেদাভেদ; যেকোনো প্রয়োজনে পুরো গ্রামের মানুষ এক হয়ে চিত্তরঞ্জনদের পাশে এসে দাঁড়ায়। চিত্তরঞ্জন ও নিরঞ্জনও গ্রামের প্রতিটি মানুষের সুখে-দুঃখে নিজেদের উজাড় করে দেন। ফলে হাজারো মানুষের এই গাঁয়ে একা একটি পরিবার হয়েও তারা আজ পুরো গ্রামের পরম স্বজন।
এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করার সময় অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী প্রবীণ লাল মোহাম্মদ। তার দিকে তর্জনী উঁচিয়ে চিত্তরঞ্জন বললেন, “ওই যে, ওই লোকটা আমার চাচা। এই গ্রামের সবাই আমার বাপ-চাচা-ভাই।” প্রবীণ মানুষটিও মাথা নাড়িয়ে হাসিমুখে তার কথায় সায় দেন।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা লাল মোহাম্মদ বলেন, “আমরা একসঙ্গে চলাফেরা করি, ওঠাবসা করি। কারোর সঙ্গে কখনো কোনো গণ্ডগোল হয়নি। তাদের ধর্ম তারা পালন করে, আমাদের ধর্ম আমরা পালন করি। কোনো ঝামেলা হয় না। তাদের বাড়িতে আমরা দাওয়াতে যাই, তারাও আমাদের এখানে আসে।”
স্থানীয় মুদি দোকানি জাকির আলী বলেন, “আমাদের সঙ্গে তাদের মেলামেশা অত্যন্ত গভীর। আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই। ভাই-বন্ধুর মতোই আমাদের সম্পর্ক।”
স্থানীয় ওয়াক্তিয়া মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমান বলেন, “আমাদের পিরোজপুর গ্রামে দুজন হিন্দু ভাই পরিবার নিয়ে থাকেন, তাদের চাচা ডাকি। উনাদের বিপদ-আপদে আমরা এগিয়ে যাই, আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা লাগলে তারাও এগিয়ে আসেন। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি। কখনো তাদের সঙ্গে বিবাদে জড়াইনি, আশা করি ভবিষ্যতেও জড়াব না।”
সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা পারিবারিক সুখ-দুঃখের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি চিত্তরঞ্জন কর্মকার। তিনি জানান, সনাতন ধর্মের নানা উৎসবে পুরো গ্রামে আনন্দের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের মুসলিম প্রতিবেশীরা শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন পরিবারটিকে।
মুক্তকণ্ঠকে চিত্তরঞ্জন বলেন, “এই গ্রামে আমাদের কখনো মনে হয় না আমরা একা। কেউ আমার ভাই, কেউ আমার চাচা। পর বলতে এই গ্রামে কেউ নেই, সবাই আমাদের নিজের লোক।”
তিনি আরও বলেন, “কয়েক হাজার মুসলিম মানুষের মধ্যে আমরা কেবল ৬ জন হিন্দু। আমার ৬ মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে ভালোভাবে বিয়ে দিয়েছি। স্থানীয়দের সহযোগিতাতেই আমি মেয়েগুলোকে পাত্রস্থ করতে পেরেছি।”
চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী পঞ্চমী রানী স্বামীর কথায় সায় দিয়ে বলেন, “আমরা এই গ্রামে বহুদিন ধরে আছি, কেউ কখনো আমাদের ক্ষতি করেনি। নিজেদের বাপ-চাচারা যেভাবে খেয়াল রাখেন, আমরাও এই গ্রামে সেই আদরেই আছি। আমরা খুব ভালো আছি।”
পিরোজপুর গ্রামটি শাহবাজপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত। এখানকার সংরক্ষিত মহিলা আসনের জনপ্রতিনিধি শিল্পীয়ারা খাতুন বলেন, গ্রামটিতে মাত্র একটি হিন্দু পরিবার বসবাস করে। পরিবারটি সবার সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলেমিশে আছে। স্থানীয়রা সবসময় তাদের পাশে থাকেন, কখনো একা ভাবতে দেন না।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাযহারুল ইসলাম বলেন, এ বছর উপজেলায় ৫১টি মন্দিরে দুর্গাপূজা হচ্ছে। উপজেলাটি সীমান্ত এলাকা; সীমান্তসংলগ্ন ৪-৫টি ইউনিয়ন আছে। সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার সঙ্গে পূজা উদযাপন করা হচ্ছে। এজন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এখানকার মানুষের মধ্যে একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। এমনকি ইমাম এবং এলাকার অনেক মুসলমানকে নিয়ে একটি সম্প্রীতি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটি নিয়ে সবাই ভালো অবস্থানে রয়েছেন। এখানে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি, আশা করছি কোনো সমস্যা হবেও না।
তিনি আরও বলেন, “পূজামণ্ডপগুলো ঘুরে যতটুকু দেখেছি, সেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে রয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করছেন। সম্প্রীতির জায়গায় সকলেই ভালো আছেন, কোনো সমস্যা নেই।”