মেট্রোরেলের প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে গিয়েছেন ৬৪ বছর বয়সী নজীবুর রহমান। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন এবং বসার জন্য অনুরোধ জানালেও কেউ সাড়া দেননি বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর ছেলে নাকিবুর রহমানের। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অনুরোধের এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই নজীবুর রহমান মেট্রোরেলের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত নজীবুর রহমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ২৪ অক্টোবর বিকেলে মেট্রোরেলে এই করুণ ঘটনার মাধ্যমে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। বাবার এই আকস্মিক প্রয়াণের পর একটি গভীর আক্ষেপ বয়ে বেড়াচ্ছেন ছেলে নাকিবুর। তিনি মঙ্গলবার রাতে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ছেলে হিসেবে আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে বসতে দিতেন। তাহলে হয়তো বাবা এভাবে নিচে না পড়ে, কারও কোলে মাথা রেখে মারা যেতে পারতেন।’
নাকিবুর রহমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন সদস্য এবং একই সঙ্গে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি জানান, ২৪ অক্টোবর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা। ওই অনুষ্ঠান শেষ করে বেলা তিনটার দিকে শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশ্যে মেট্রোরেলে আরোহণ করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। সেই সহকর্মীর কাছ থেকেই তিনি পুরো ঘটনার বিবরণ জানতে পারেন।
কয়েক দিনের ছুটি শেষ হওয়ার কারণে ওইদিন মেট্রোরেলে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। বসার আসন খালি না থাকায় নজীবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মী দুজনেই ভেতরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভিড়ের প্রচণ্ড ঠেলাঠেলিতে এক পর্যায়ে তাঁদের দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
নাকিবুর রহমান আরও জানান, বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মেট্রোরেল যখন শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছায়, তখন ঠেলাঠেলির মধ্যে তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই মুহূর্তে সিটে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে তিনি কয়েকবার বসার সুযোগ চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁর অনুরোধে সাড়া দেননি। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই তিনি মেঝেতে পড়ে যান।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা তাঁকে ধরে তোলার চেষ্টা করেন। শোরগোল শুনে নজীবুর রহমানের সহকর্মীও দ্রুত সেখানে ছুটে আসেন। অন্য যাত্রীদের সহায়তায় পরীক্ষা করে দেখা যায়, নজীবুর রহমান আর বেঁচে নেই। নাকিবুরের ধারণা, মেট্রোরেলের ভেতরে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই তাঁর বাবার মৃত্যু ঘটেছিল।
শেষবিদায়ে থাকতে পারেননি পরিবারের আর কেউ
নাকিবুর রহমান জানান, তাঁর বাবার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা ছিল। বাবাকে মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর স্টেশনে নামানোর পর আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছান নাকিবুর। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁর বাবাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন।
বাবার মৃত্যুর সেই কঠিন সময়ে পরিবারের অন্য সদস্যরা পাশে থাকতে পারেননি। নাকিবুর জানান, তাঁর মা ও ছোট ভাই ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। সৌদি আরবের বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁরা সময়মতো দেশে ফিরতে পারেননি। তাঁর বোন পরিবারসহ নিউজিল্যান্ডে থাকেন এবং আরেক ভাই সেখানে পড়াশোনা করছেন। তাঁরাও বাবার মৃত্যুর পর দেশে আসতে পারেননি। পরিবারের এই সদস্যদের অনুপস্থিতিতেই বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে নজীবুর রহমানকে দাফন করা হয়।
বাবার মৃত্যুর ঘটনা স্মরণ করে নাকিবুর বলেন, ‘আমি কাউকে দোষারোপ করছি না। যে কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। বয়স্ক মানুষের প্রতি আমাদের সবার সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। তাঁদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন।’