রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোহেল রানা। এবারের দুর্গাপূজার ছুটিতে ট্রেনে চড়ে গ্রামের বাড়ি মোহনগঞ্জ যাচ্ছিলেন তিনি। ফার্মগেট স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে চড়ে মতিঝিল নামেন সোহেল। সেখান থেকে অটোরিকশায় ৪০ টাকা ভাড়ায় কমলাপুর রেলস্টেশনে যান। অথচ ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলে ভাড়া লেগেছে মাত্র ২৮ টাকা। বাড়তি খরচের পাশাপাশি স্টেশন থেকে ওঠানামার ঝক্কি এবং অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে তাকে।
গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে সোহেল রানার সঙ্গে কথা হয়। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ফার্মগেট থেকে খুব কম সময়ে মেট্রোরেলে মতিঝিল পৌঁছান। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে সময় ও খরচ কম লাগত।”
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হবে। আর জুলাইয়ের শুরুতে যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এই অংশটি চালু হতে পারে।
রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেলের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে শুধু মতিঝিল স্টেশন দিয়েই দৈনিক প্রায় এক লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। অর্থাৎ মতিঝিল থেকে তারা দেশের প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যে ছড়িয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারিত হলে যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।
উল্লেখ্য, ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কোম্পানিটি এর আগে জানিয়েছিল যে, আগামী জানুয়ারিতে কমলাপুর পর্যন্ত পথে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হবে এবং এপ্রিলে যাত্রী পরিবহন শুরু হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হবে এবং জুলাইয়ের শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশে বর্তমানে রেললাইন বসানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক কাজও চলমান রয়েছে। তবে স্টেশনের ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা এবং আরও কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্র জাপান থেকে আসতে দেরি হতে পারে বলে জানা গেছে, যার ফলে চালুর তারিখ কিছুটা পিছিয়ে গেছে। এছাড়া কমলাপুর মেট্রোস্টেশনের লিফট স্থাপনসহ কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে।
ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর গত আগস্ট পর্যন্ত মেট্রোরেলে মোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছেন। ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা সাড়ে চার লাখের বেশি থাকে। প্রকল্প গ্রহণের সময় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিদিন পাঁচ লাখ যাত্রী হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। অর্থাৎ বর্তমান যাত্রীর সংখ্যা সেই প্রাক্কলনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশ চালু হলে দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
নির্মাণকাজে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের কাছ থেকে জানা গেছে, মেট্রোরেলের লাইন বসানোর কাজ এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ডিসেম্বর নাগাদ এই কাজ শেষ করতে চায়। অন্যদিকে বিদ্যুতের কাজ প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
গত সপ্তাহে মতিঝিল–কমলাপুর মেট্রোস্টেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের অংশে অস্থায়ী সিঁড়ি দিয়ে শ্রমিকেরা ওঠানামা করছেন। শ্রমিকেরা জানান, ইতিমধ্যে মেট্রোরেলের উড়ালসড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে রেললাইন বসানোর কাজ চলছে। মেট্রোরেল সম্পূর্ণ বিদ্যুতে চলে, তাই দুই পাশে বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়েছে যার ওপর তার টানা হবে। ট্রেনের সঙ্গে এই তারের সংযোগের মাধ্যমেই মেট্রোরেল চলাচল করবে।
কমলাপুর মেট্রোস্টেশনের নিচে বালু ও পাথরের স্তূপ রাখা হয়েছে। শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত মনির হোসেন জানান, স্টেশনের কাজ চলার কারণে নিচের সড়কটি বেহাল হয়ে আছে, তাই শীঘ্রই সড়ক মেরামতের কাজ শুরু হবে।
প্রকৌশলীদের মতে, লাইন বসানোর কাজ ৩০ শতাংশ এবং বিদ্যুতের কাজ ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে। এছাড়া কমলাপুর মেট্রোস্টেশনে লিফট বসানো, সংকেতব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের যন্ত্রপাতি স্থাপন, টাইলস লাগানো, শৌচাগার প্রস্তুত করা এবং পানির পাম্প বসানোর মতো কিছু কাজ এখনো বাকি আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায় থেকে জুন–জুলাইয়ে মেট্রোরেল চালুর নির্দেশনা আছে। তবে আনুষঙ্গিক কিছু কাজ বাকি রেখেই জুলাইয়ে মেট্রো চলাচল শুরু করতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।”
উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এই মেট্রোরেল রুটের নাম এমআরটি লাইন–৬। এই প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুল ওয়াহাব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মতিঝিল–কমলাপুর অংশের অবকাঠামো নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ। আগামী জুনের শেষে বা জুলাইয়ের শুরুতে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।” তিনি আরও জানান, ঠিকাদারের সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও তিন মাস আগেই কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এতদিন কমলাপুর রেলস্টেশন দিয়ে মূলত দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচল করত। তবে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেনের সংখ্যা বেড়েছে। এই অবস্থায় মেট্রোরেল চালু হলে বাড়তি যাত্রী পাওয়া যাবে এবং সড়কের ওপর চাপ কমবে।
ঢাকার যানজট নিরসনে ২০১২ সালে মেট্রোরেল প্রকল্প নেওয়া হয়। এর নির্মাণ ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, যার প্রায় ৫৯ শতাংশ জাইকার ঋণ। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং পরের বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করা হয়।
মতিঝিল–কমলাপুর অংশটি ২০২৫ সালের জুনে চালুর সিদ্ধান্ত ছিল। ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার দূরত্বের এই সম্প্রসারিত অংশে উড়ালসড়ক ও কমলাপুর স্টেশন নির্মাণের জন্য ২০২৩ সালে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। ভৌত কাজ করছে থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল–থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি।
অন্যদিকে, ইলেকট্রো–মেকানিক্যাল কাজের ঠিকাদার নিয়োগে দেরি হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঠিকাদার এই কাজের জন্য ৬৫১ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করেছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যয় কমানোর জন্য চাপ দেয়। এরপর দর-কষাকষির মাধ্যমে ব্যয় ১৮৬ কোটি টাকা কমিয়ে ৪৬৫ কোটি টাকায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসন অ্যান্ড ট্যুবরোকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা বর্তমানে এই কাজ করছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এত দিন কমলাপুর রেলস্টেশন দিয়ে শুধু দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচল করত। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেন বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল চালু হলে বাড়তি যাত্রী পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সড়কের ওপর চাপ কমবে। ইতিমধ্যে মেট্রোরেলে বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তা দ্রুত তুলে আনতে হলে যাত্রী চাহিদার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে।”