পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বক্তব্যের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)। আইজিপির ওই বক্তব্যকে পুলিশের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি সময়োপযোগী আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

বিপিএসএ-এর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইজিপির বক্তব্যটিকে প্রচলিত আইন ও বিদ্যমান বিধিবিধানের আলোকে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য হলো আইনের নির্ধারিত সীমানার ভেতরে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিটি আজ গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।

উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব।” একই অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পাওয়ার কারণে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগ তোলেন। এই মন্তব্যের পর আইজিপি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। এমনকি আজ এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইজিপির বক্তব্যকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, “সরকার তো ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।”

এমন টানটান উত্তেজনার মধ্যে বিপিএসএ তাদের বিবৃতিতে আরও জানায়, দেশের বর্তমান পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব কালচারের প্রভাব এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পুলিশ সদস্যদের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে যখন নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, আবার অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে যখন দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিবৃতিতে জানানো হয়, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে পুলিশ সদস্যদের ওপর মোট ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ৪ জন সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিপিএসএ মনে করে, এই বাস্তব পরিস্থিতি পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের জন্য একটি উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। তাই পুলিশ সদস্যদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে তাঁরা প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান মেনে নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে এবং পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশ সর্বদা দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তারা অবিচল ও অঙ্গীকারবদ্ধ।

সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, অপরাধ দমনে পুলিশ যদি তাদের আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অযথা দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের সক্ষমতা সুদৃঢ় করার একটি সময়োপযোগী আহ্বান হিসেবে আইজিপির বক্তব্যকে বিবেচনা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে, আইজিপির এই বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে একটি বিপজ্জনক সংকেত হিসেবে দেখছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠন। তারা আইজিপির জবাবদিহিতা, সরকারের ব্যাখ্যা এবং বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। বেশ কিছু রাজনৈতিক দলও এই মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের সম্পর্কে করা মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন।

তীব্র সমালোচনার মুখে গতকাল রাতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আইজিপির বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার অর্থে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তবে পরবর্তীতে এই ব্যাখ্যা সংশোধন করে বলা হয়, ‘আক্ষরিক’ শব্দের পরিবর্তে শব্দটি ‘রূপক’ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সম্পর্কে করা মন্তব্যের বিষয়ে বলা হয়, “তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি, এটি অসাবধানতাবশত হয়েছে।”