১৯৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রথম ছয় ওভারেই ১১৮ রান তুলে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের ওপর তাণ্ডব চালালেন অভিষেক শর্মা ও বৈভব সূর্যবংশী। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে এর আগে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। মাত্র ৩৫ বলে সেঞ্চুরি হাঁকানো অভিষেক শেষ পর্যন্ত ৩৮ বলে ১১৩ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন। তাঁর এই ব্যাটিং ঝড়ে ৪০ বল হাতে রেখেই ৬ উইকেটের বড় জয় পেয়েছে ভারত। পাঁচ ম্যাচের এই সিরিজে টানা তৃতীয় জয়ের ফলে দুই ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ নিশ্চিত করল সফরকারী দল।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ওয়েলিংটনে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে টস হেরে আগে ব্যাটিং করতে নেমে ৩ উইকেটে ১৯৮ রান সংগ্রহ করে নিউজিলিল্যান্ড। ড্যারিল মিচেল অপরাজিত ৮৯ রানের বড় ইনিংস খেলে দলের সংগ্রহ বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের কোনো কাজে আসেনি সেই রান। জবাবে মাত্র ১৩.২ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৯৯ রানের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ভারত। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ১৯০ বা তার বেশি রানের লক্ষ্য তাড়ায় সবচেয়ে বেশি বল হাতে রেখে জয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে তারা।

রান তাড়ার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন দুই ভারতীয় ওপেনার। প্রথম ওভারেই জ্যাকব ডাফির আক্রমণ সামলে ২৬ রান তুলে নেন অভিষেক ও বৈভব। পরের ওভারে অ্যাডাম মিলনেকেও রেয়াত করেননি তারা। মাত্র ২.২ ওভারের মাথায় দলীয় ফিফটি পূর্ণ করে ভারত, যা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাদের দ্রুততম দলীয় ফিফটির রেকর্ড।

চতুর্থ ওভারে কাইল জেমিসনকে ছক্কা মেরে মাত্র ১৫ বলে ব্যক্তিগত ফিফটি পূর্ণ করেন অভিষেক। অন্য প্রান্তে সমান তালে আক্রমণ চালিয়ে যান মাত্র ১৫ বছর বয়সী বৈভব। এই দুই তরুণের ব্যাটিংয়ের দাপটে পাঁচ ওভারের মধ্যেই ১০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করে ভারত।

ষষ্ঠ ওভার শেষে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় বিনা উইকেটে ১১৮ রান। পুরুষদের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ারপ্লেতে এটিই এখন সর্বোচ্চ সংগ্রহ। এর আগে রোমানিয়ার রেকর্ড ছিল, যারা ২০২১ সালে সার্বিয়ার বিপক্ষে প্রথম ছয় ওভারে ১১৬ রান তুলেছিল। এবার সেই রেকর্ডটি ভেঙে দিলেন ভারতের দুই তরুণ ওপেনার।

ভারতের দুই ওপেনারের ১৩৩ রানের জুটিটি অষ্টম ওভারের প্রথম বলে ভেঙে যায়। ম্যাথু ফিশারের বলে ড্যারিল মিচেলের হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন বৈভব। ১৯ বলে ৪টি চার ও ৪টি ছক্কায় ৪৫ রান করেন এই কিশোর ক্রিকেটার। মাত্র ৪৩ বলে ১৩৩ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন তারা।

সঙ্গী ফিরে গেলেও থামেননি অভিষেক। নবম ওভার শেষে তাঁর সংগ্রহ ছিল ৯৮ রান। দশম ওভারের প্রথম বলে এক রান নিয়ে ৯৯-এ পৌঁছানোর পর তৃতীয় বলে চার মেরে পূর্ণ করেন সেঞ্চুরি। মাত্র ৩৫ বলে শতরান করার পর ম্যানচেস্টার সিটির তারকা ফুটবলার আর্লিং হলান্ডের পরিচিত মেডিটেশন ভঙ্গিতে উদ্‌যাপন করেন ভারতীয় ওপেনার।

একই ওভারের শেষ বলে জেমিসনের শিকার হওয়ার আগে অভিষেক ৩৮ বলে ১১৩ রান করেন। তাঁর এই ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও ১১টি ছক্কা। স্ট্রাইক রেট ছিল ২৯৭.৩৭।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এক ইনিংসে তৃতীয়বারের মতো অন্তত ১০টি ছক্কা মারার অনন্য কীর্তি গড়লেন অভিষেক। ২০২৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩টি এবং গত সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১১টি ছক্কা মেরেছিলেন তিনি। এবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও হাঁকালেন ১১টি ছক্কা। ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে এই বিশেষ কীর্তি অন্য কারও নেই।

অভিষেক যখন আউট হন, তখন মাত্র ১০ ওভারে ভারতের সংগ্রহ ২ উইকেটে ১৭৮ রান। জয়ের জন্য তখন প্রয়োজন ছিল মাত্র ২১ রান। সঞ্জু স্যামসন ১৩ বলে ১৮ এবং অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার ১০ বলে ৫ রান করে ফিরলেও জয় পেতে কোনো সমস্যা হয়নি ভারতের। শেষ পর্যন্ত ১৪তম ওভারের দ্বিতীয় বলে চার মেরে জয় নিশ্চিত করেন নামান ধীর।

এক বল খেলে চার রানে অপরাজিত থাকেন ধীর। অন্য প্রান্তে এক রানে অপরাজিত ছিলেন তিলক ভার্মা। নিউজিল্যান্ডের হয়ে জেমিসন নেন ২ উইকেট। একটি করে উইকেট পান মিচেল স্যান্টনার ও ম্যাথু ফিশার।

ভারতের এই জয় আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে রান তাড়ার নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। এর আগে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ১৯০ বা তার বেশি রানের লক্ষ্য তাড়ায় সবচেয়ে বেশি ২৮ বল হাতে রেখে জিতেছিল ভারত। গত জানুয়ারিতে রায়পুরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করে সেই রেকর্ড গড়েছিল তারা।

এবার নিজেদের সেই রেকর্ড ভেঙে ৪০ বল হাতে রেখেই জয় পেয়েছে ভারত। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির সামগ্রিক ইতিহাসেও এটি দ্বিতীয় সেরা রেকর্ড। ২০২৪ সালে সাইপ্রাসের বিপক্ষে ১৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ৪২ বল হাতে রেখে জিতেছিল এস্তোনিয়া।

এর আগে নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের শুরুটা খুব একটা সুখকর ছিল না। দলীয় ৪ রানেই টিম সাইফার্টকে ফিরিয়ে দেন আর্শদীপ সিং। এরপর ফিন অ্যালেনকে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে ৮৬ রানের জুটি গড়েন ড্যারিল মিচেল। অ্যালেন ২৫ বলে ৫ ছক্কায় ৪০ রান করে নিতিশ কুমার রেড্ডির শিকার হন।

গ্লেন ফিলিপস ১৪ বলে ১৭ রান করে আউট হওয়ার পর বেভন জ্যাকবসকে নিয়ে দলের রান বাড়ান মিচেল। দুজনের অবিচ্ছিন্ন চতুর্থ উইকেট জুটিতে আসে ৭৫ রান। মিচেল ৫২ বলে ৫টি চার ও ৫টি ছক্কায় ৮৯ রানে অপরাজিত থাকেন। জ্যাকবস করেন ২৩ বলে অপরাজিত ৩৯ রান।

ভারতের হয়ে আর্শদীপ, অক্ষর প্যাটেল ও নিতিশ একটি করে উইকেট নেন। বড় সংগ্রহ গড়লেও অভিষেক ও বৈভবের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের সামনে সেই রান যথেষ্ট হয়নি নিউজিল্যান্ডের জন্য।

ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন অভিষেক। আগের দুই ম্যাচে ৪ উইকেটের ব্যবধানে জেতার পর এবার আরও বড় ব্যবধানে জয় পেল ভারত। টানা তিন জয়ে সিরিজ নিশ্চিত করা সফরকারীদের সামনে এখন প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার সুযোগ।

আগামী শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে সিরিজের চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে মুখোমুখি হবে দুই দল। পঞ্চম ও শেষ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ১ নভেম্বর হ্যামিল্টনে।