নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তনের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কোনো মৌলিক মতভিন্নতা নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই বিষয়ে একটি সাধারণ সমঝোতা তৈরি হয়েছে। তবে এই সরকার গঠনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং কোন প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

একটি সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করার বিষয়ে 'জুলাই সনদে' ঐকমত্য থাকলেও, বাছাই প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে অংশীজনদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করছে। এরই মধ্যে তারা একটি নতুন ধারণার কথা জানতে পেরেছে। যদিও এই সরকারের চূড়ান্ত রূপরেখা এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং নতুন প্রস্তাবটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলগুলোর কোনো সদস্য নেই, কারণ তারা এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে আগ্রহী নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা। যদি সর্বসম্মত আলোচনার ভিত্তিতে এই সরকারের রূপরেখা চূড়ান্ত করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে আবারও বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়, তবে এই সরকার গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। কারণ, তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হবেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ সালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সংবিধানে তখন এর কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না। পরবর্তীতে রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপে ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। গত বছর আপিল বিভাগের এক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংক্রান্ত বিধানগুলো পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমান সরকারও এই ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত রোববার সাংবাদিকদের বলেন, “আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।”

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান ছিল, সেখানে বলা হয়েছিল, সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি হবেন এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। যদি তিনি দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান বা পাওয়া না যায়, তবে তাঁর ঠিক আগে অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। এরপরও কাউকে পাওয়া না গেলে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্যে যিনি সর্বশেষে অবসরে গেছেন, তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।

যদি আপিল বিভাগের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রাজি না হন, তবে রাষ্ট্রপতি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কোনো ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব দেবেন। সব প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপতি নিজেই তাঁর নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।

২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) অভিযোগ করে যে, পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান করতে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে। এই ইস্যুতে দলটি আন্দোলন শুরু করে। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর তাদের ‘লগি-বইঠা’ আন্দোলনে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে চারজন ছিলেন জামায়াতের কর্মী এবং একজন ওয়ার্কার্স পার্টির কর্মী। এমন চরম নৈরাজ্যের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন। এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত পরিণতিতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ আসে এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও, রাষ্ট্রপতি এবং বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় জোরালো মত প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে সংবিধান সংশোধন কমিটির আলোচনাতেও অংশীজনরা বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে রূপরেখা তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে বাছাই করার পদ্ধতি কী হবে?

জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার একটি বিস্তারিত রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, একটি সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্ধারিত হবেন। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি ওই বাছাই কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে সর্বোচ্চ ১৫ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন।

বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া ৩০টি দল ও জোট এই প্রস্তাবে একমত হয়েছিল, যদিও বাছাই প্রক্রিয়ার কিছু বিষয়ে তাদের ভিন্নমত ছিল।

সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া বা অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে অথবা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে।

জুলাই সনদে বলা হয়েছে, বাছাই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দল থেকে) এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি থাকবেন। কমিটি গঠিত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের কাছ থেকে যোগ্য ব্যক্তির নাম চাওয়া হবে। প্রতিটি দল বা স্বতন্ত্র সদস্য কেবল একজনের নাম প্রস্তাব করতে পারবেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা সংসদ সচিবালয়ে জমা দিতে হবে। কমিটি নিজস্ব উদ্যোগে নাম অনুসন্ধান করতে পারবে। তবে জামায়াতে ইসলামী ‘নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল’-এর পরিবর্তে শুধু ‘রাজনৈতিক দল’ শব্দটি রাখার পক্ষে।

এরপর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটির সদস্যরা সভায় মিলিত হয়ে প্রাপ্ত নামগুলো নিয়ে আলোচনা করে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবেন এবং রাষ্ট্রপতি তাঁকে নিয়োগ দেবেন।

যদি ১২০ ঘণ্টার মধ্যে এই পদ্ধতিতে কাউকে চূড়ান্ত করা না যায়, তবে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি দল বা জোট ৫ জন, প্রধান বিরোধী দল বা জোট ৫ জন এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল ২ জন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। স্পিকার এই নামগুলো প্রকাশ করবেন। এরপর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি দল বা জোটের তালিকা থেকে প্রধান বিরোধী দল বা জোট যেকোনো একজনকে বেছে নেবে এবং একইভাবে প্রধান বিরোধী দলের তালিকা থেকে সরকারি দল একজনকে বেছে নেবে। যদি প্রস্তাবকারী দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয় অথবা পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারজন একমত হন, তবে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হবেন।

এই প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার বিভাগের দুজন প্রতিনিধি বাছাই কমিটিতে যুক্ত হবেন, তবে তাঁরা নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না। এরপর ৭ সদস্যের কমিটি স্পিকারের তত্ত্বাবধানে ‘র‍্যাঙ্কড চয়েজ’ পদ্ধতিতে একজনকে বেছে নেবেন। তবে এই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে এবং জুলাই সনদের মূল রাজনৈতিক মতবিরোধ এখানেই।

জুলাই সনদে আরও বলা হয়েছে, এভাবেও নিয়োগ সম্ভব না হলে ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণ করতে হবে, তবে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া যাবে না। এই প্রস্তাবে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৮টি দল একমত ছিল।

গত শনিবার সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভায় একটি নতুন ধারণা উত্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবটি হলো—সংসদের উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের চেয়ে বেশি হবে এবং উচ্চকক্ষ থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে উচ্চকক্ষের স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে এসেছে, সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষের স্পিকার নির্বাচিত হবেন এবং তাঁকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হবে। পাশাপাশি অন্যান্য উপদেষ্টাদেরও উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে বিশেষ কমিটির সভায় এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “যদি উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়, তাহলে এই সরকার গঠনের যে উদ্দেশ্য, তা পূরণ হবে না। কারণ, তিনি হবেন রাজনৈতিক ব্যক্তি। এতে জটিলতা আরও বাড়বে। আসলে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রয়োজন। সেটি অবশ্যই ঐকমত্যের ভিত্তিতে করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জুলাই সনদের প্রস্তাবে বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য আছে। এখন দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছা দেখাতে না পারলে দেশ ভয়ানক সংকটের দিকে যেতে পারে।”