নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং বাধ্যতামূলক গণভোটের বিধান পুনরায় সংবিধানে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যৎ বিতর্ক এড়াতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের মতামত নিয়ে একটি সর্বগ্রহণযোগ্য পদ্ধতি তৈরি করতে চায় সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পর সাংবাদিকদের দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, “জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার জন্য যে আইন করা হয়েছে, তা অধ্যাদেশ থেকে আইনে পরিণত করা হয়েছে। জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও দায়মুক্তি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও এর সদস্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে পার্লামেন্টে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোন প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে, কারা থাকবে, সে বিষয়টি পার্লামেন্টে আলোচনার মধ্য দিয়েই আসবে। এখন সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে মতামত চাওয়া হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে নানা প্রস্তাব আসতে পারে। সেগুলো আমরা স্টাডি করে এমন একটা তত্ত্বাবধায় সরকারপদ্ধতি ধারণ করতে চাই, যেটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে।”
অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক ছিল। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানে সর্বশেষ অপশন হিসেবে রাষ্ট্রপতির থাকার কথা ছিল। এটি নিয়ে অতীতে অনেক বিতর্ক হয়েছে। তাই আমরা বলেছি যে রাষ্ট্রপতিকে সর্বশেষ অপশন হিসেবে না রাখলেই ভালো হয়।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে কমিটি বর্তমানে বিভিন্ন মহলের মতামত সংগ্রহ করছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এছাড়া এই ব্যবস্থা যাতে ভবিষ্যতে কেউ সহজে পরিবর্তন করতে না পারে, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
গণ-অভ্যুত্থানকালীন গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি জানান, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দাবি হলো মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা বলেছি, বিচার ত্বরান্বিত করতে সরকার আন্তরিক। বিচারপ্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে চলছে। নির্ধারিত আইন অনুসারে আদালত কাজটি করবে। তবে তদন্ত, প্রসিকিউশন, অভিযোগ গঠনসহ আমাদের সব কাজ আমরা দ্রুততার সঙ্গে করব।”
উক্ত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক এবং সাকিলা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি, আহত জুলাই যোদ্ধা এবং বিভিন্ন সংগঠনের মোট ৬৩ জন আমন্ত্রিত অতিথি অংশ নেন।
বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জুলাই ঘোষণাপত্রকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা, যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা ও দায়মুক্তি, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচার এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে তাদের প্রস্তাবনা পেশ করেন। আলোচনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের উপযুক্ত অংশে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও আইনি জটিলতা নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধানসহ নানা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এছাড়া রাজনীতিতে নারীদের জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আমন্ত্রিত অতিথিদের দেওয়া সব প্রস্তাব কমিটির বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে এবং লিখিত প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্রের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “অতিথিরা জুলাই ও গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চান। বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যেন আমরা সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় ধারণ করি। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও দিয়েছেন। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নকালে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও শক্তি যেভাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেভাবে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
দায়মুক্তির বিষয়ে পুনরায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার জন্য যে আইন করা হয়েছে, তা অধ্যাদেশ থেকে আইনে পরিণত করা হয়েছে। জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও দায়মুক্তি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
পরিশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রক্রিয়াটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিক্ষাবিদদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব পাওয়ার পর কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।