লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা সীমান্ত এলাকা থেকে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্য বাঘটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি গত দুই দিনে। এরই মধ্যে হাতীবান্ধার সিঙ্গিমারি এলাকায় বাঘটি দেখা গেছে বলে নতুন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের গ্রামগুলোতে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাঘের ভয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা এখন রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। অন্যদিকে, বাঘ উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ফসলি জমির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুরের সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইন জানান, সিঙ্গিমারিতে বাঘ দেখার খবর পাওয়ার পরপরই সেখানে একটি বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে। তল্লাশি অভিযান জোরদার করতে ড্রোন ও থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয়দের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। বন বিভাগ এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরা বর্তমানে ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন।
এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে ড্রোনের মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হলেও বাঘটির সন্ধান মেলেনি। তবে সিঙ্গিমারিতে বাঘ দেখার নতুন খবরের পর প্রশাসন ও বন বিভাগ পুনরায় তৎপর হয়ে উঠেছে। বাঘটি লোকালয়ে ঢুকে মানুষের জানমালের ক্ষতি করতে পারে—এমন আশঙ্কায় গ্রামের অনেক যুবক লাঠিসোঁটা ও টর্চলাইট নিয়ে রাতভর সতর্ক পাহারা দিয়েছেন।
প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, বাঘটিকে খুঁজে বের করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ ও বন বিভাগের একটি যৌথ টহল দল কাজ করে যাচ্ছে। এলাকাবাসীকে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার এবং সন্ধ্যার পর একা চলাফেরা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানের কারণে কৃষকদের ফসলি জমির যে ক্ষতি হয়েছে, তা তালিকাভুক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের ৯০৫ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারসংলগ্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণে এক নারীসহ তিনজন আহত হন। আহতরা হলেন আমঝোল গ্রামের শরিফা বেগম (৩৪), নজরুল ইসলাম (৪৩) ও আফসার আলী (৪০)। বর্তমানে তারা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ধানক্ষেতে ছাগল আনতে গেলে শরিফা বেগমের ওপর বাঘটি আক্রমণ করে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে নজরুল ইসলাম ও আফসার আলীও আহত হন।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবির পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে ফাঁকা গুলিও ছোড়া হয়। রোববার মধ্যরাতে ড্রোনের ক্যামেরায় সীমান্তের জঙ্গলে বাঘটিকে দেখা গেলেও শেষ রাতের দিকে সেটি নজরদারির বাইরে চলে যায়। এরপর সোমবার রাতে সিঙ্গিমারিতে বাঘ দেখার নতুন খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় আতঙ্ক আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানান, বাঘটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারের জন্য ঢাকা ও রংপুর থেকে বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। দ্রুততম সময়ে বাঘটিকে লোকালয় থেকে উদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তিনি এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
বিভাগীয় বন ও সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তা নুর ইসলাম বলেন, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সোমবার থেকেই উদ্ধার অভিযান চলছে। কয়েকটি স্থানে বাঘের চলাচলের চিহ্ন বা পদচিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি ও কৌতূহলী জনতার ভিড়ের কারণে বাঘটি ভয় পেয়ে অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে বা বনাঞ্চলে সরে গিয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বন বিভাগের দলগুলোর টহল ও তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার নতুন করে বাঘের সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা চিহ্ন পাওয়া না গেলে পরিস্থিতি বিবেচনায় চলমান অভিযানের প্রাথমিক সমাপ্তি টানার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
এলাকাবাসীকে সতর্ক করে নুর ইসলাম বলেন, “আতঙ্কিত না হলেও সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। বাঘটিকে উত্যক্ত করা বা একা ঘেরাও করার চেষ্টা করা যাবে না। রাতে চলাচলের সময় দলবদ্ধভাবে আলো জ্বালিয়ে চলাচল করতে হবে। বাঘের দেখা মিললে বা এর অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত বন বিভাগ, বিজিবি বা স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে হবে।” বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে বলে তিনি জানান।