একটি শাড়ির মামলা চলছে, আবার অন্য একটি শাড়ি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আইনি লড়াই; এবার অভিযোগ উঠেছে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়ার। জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিন তিশাকে ঘিরে শাড়ি সংক্রান্ত বিতর্ক যেন শেষ হতে চাইছে না। একটি জামদানি শাড়ি নিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে দায়ের করা মামলার আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান। এরই মধ্যে ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের আরেকটি শাড়ি নিয়ে করা মামলার পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া ওই মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তিশার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করা হয়েছে। একের পর এক আইনি জটিলতার বেড়াজালে আটকা পড়েছেন এই অভিনয়শিল্পী। অন্যদিকে, শাকিব খানের সঙ্গে ‘সোলজার’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক হওয়ার যে কথা ছিল, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

বিতর্কের সূত্রপাত প্রথম শাড়ি নিয়ে

২০২৫ সালের অক্টোবরে অনলাইন পোশাক বিক্রির প্রতিষ্ঠান অ্যাপোনিয়ার একটি জামদানি শাড়ি নিয়ে আলোচনায় আসেন তানজিন তিশা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিল, শাড়িটি নিয়ে প্রচারণা করার কথা থাকলেও তিশা তা করেননি, এমনকি শাড়ির মূল্যও পরিশোধ করেননি। শাড়িটির দাম ছিল ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। অ্যাপোনিয়ার স্বত্বাধিকারী বিলকিস ওয়াজির দাবি, তিশা নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করে শাড়িটির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রচারণার শর্তে তাঁকে শাড়িটি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রচারণা না করায় এবং মাসের পর মাস যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তবে শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিশা। তাঁর দাবি ছিল, শাড়িটি তাঁকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ সামনে আসার পর নিজের ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছিলেন, ‘গিফট নিয়ে হয়ে গেলাম প্রতারক! হা হা! আর ফটোশুটই যদি করাতে চান, পারিশ্রমিক কই?’

২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যাপোনিয়ার পক্ষ থেকে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে মামলা করা হয়। তদন্তের পর আদালত মামলাটি আমলে নেন এবং তিশাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। চলতি বছরের ১৩ আগস্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তিনি। এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতে তাঁর জামিনের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন মঞ্জুর করা হয়। এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।

৭৫ হাজার টাকার শাড়ি নিয়ে দ্বিতীয় মামলা

প্রথম মামলার পাশাপাশি ৭৫ হাজার টাকা দামের আরেকটি শাড়ি নিয়েও তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া চৌধুরীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তাঁর কাছ থেকে শাড়িটি নিয়েছিলেন তিশা। অনুষ্ঠান শেষ করে পরদিন শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

শাড়িটি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তিশার বিরুদ্ধে গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনেন সানায়া। এই ঘটনায় ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। তদন্ত শেষে গত ২৫ মে পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিশাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে প্রতিবেদনটিতে আপত্তি জানিয়ে বাদীপক্ষ আদালতে নারাজি আবেদন করেন। গত ২৫ অক্টোবর আদালত বাদীপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেন। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলা প্রত্যাহারে হুমকির অভিযোগে নতুন মামলা

৭৫ হাজার টাকার শাড়ি সংক্রান্ত মামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৬ অক্টোবর তানজিন তিশার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন সানায়া চৌধুরী। তাঁর অভিযোগ, আগের মামলাটি তুলে নিতে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাঁকে ভয় দেখানো হয়েছে এবং মামলা প্রত্যাহার না করলে বাংলাদেশে থাকতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলাটি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে আগামী ২৩ নভেম্বর তানজিন তিশাকে আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে নতুন মামলার এই অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে; আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।

বিতর্ক নিয়ে তিশার প্রতিক্রিয়া

প্রথম মামলাটি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিশা এর আগে জানিয়েছিলেন, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আইনিভাবেই বিষয়টি মোকাবিলা করবেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘ ১২ থেকে ১৪ বছরের অভিনয়জীবনে কঠোর পরিশ্রম করে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। মাত্র ২৭-২৮ হাজার টাকার একটি শাড়ি নিয়ে প্রতারণা করার অভিযোগকে তিনি অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তিশা আরও বলেছিলেন, ‘আমি অবশ্যই আদালতে যাব। আমারও ইচ্ছা হয়েছিল আমার সঙ্গে কী ঘটেছে, সেটা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু বিচারাধীন, তাই আমি প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু বলিনি।’

৭৫ হাজার টাকার শাড়ি সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রেও তদন্তের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার কথা বলা হলেও বাদীপক্ষের আপত্তিতে সিআইডির পুনঃতদন্ত শুরু হতে যাচ্ছে। ফলে এই অভিযোগগুলোর আইনি নিষ্পত্তির জন্য এখন অপেক্ষা করতে হবে।

‘সোলজার’ সিনেমা ও অনিশ্চয়তা

শাড়ি নিয়ে একের পর এক আইনি জটিলতার মাঝে তানজিন তিশার অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শাকিব খানের সঙ্গে ‘সোলজার’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হওয়ার কথা ছিল তাঁর। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য কলকাতার একটি সিনেমা থেকেও সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ‘সোলজার’-এর শুটিং শুরু হলেও এখনো ছবিটির কাজ শেষ হয়নি। সিনেমা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে, ‘সোলজার’ সিনেমার আরও ৯ দিনের শুটিং বাকি রয়েছে। কয়েক দফা পরিকল্পনা করেও শুটিং শুরু করা যায়নি। শিল্পী ও কলাকুশলীদের সম্মানী বকেয়া থাকার পাশাপাশি শুটিংয়ে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টাকা না দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে; যদিও নির্বাহী প্রযোজক মৌমিতা হোসাইন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

‘সোলজার’ ছবিটি প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তির সম্ভাবনা জানানো হয়েছিল। পরে মুক্তির সময় ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বছরের শেষ দিকে এসেও শুটিংয়ের বাকি কাজ কবে শেষ হবে, তা নিশ্চিত নয়। ফলে তিশার ঢালিউড অভিষেক এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।