বছরের প্রথম নয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ের হিসাব বিশ্লেষণ করলে ঢালিউডের বর্তমান পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্পষ্ট। ২০২৬ সালে সিনেমা মুক্তির ক্ষেত্রে কোনো ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়নি; এমনকি বড় তারকা এবং মোটা অঙ্কের বাজেটের ছবিগুলোও ব্যবসায়িক সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—গত তিন মাসেও একই চিত্র বজায় ছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বছরের শেষ তিন মাসে কি এই মন্দার পরিস্থিতি বদলাবে?

চলতি বছরের শুরুতেই জানুয়ারিতে মুক্তি পায় দুটি সিনেমা—‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’ ও ‘ময়নার চর’। ফেব্রুয়ারিতে প্রেক্ষাগৃহে আসে ‘বরিশাইল্ল্যা পরী’। মার্চ মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পাঁচটি সিনেমা মুক্তি পায়, যেগুলি হলো—‘বনলতা এক্সপ্রেস’, ‘দম’, ‘প্রিন্স’, ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘রাক্ষস’। তবে এপ্রিলে কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। মে মাসে সবচেয়ে বেশি সিনেমা মুক্তি পায়, যার সংখ্যা ছিল ১৩টি। এর মধ্যে আটটি ছবি মুক্তি পায় ঈদুল আজহায়। জুন ও জুলাই মাসে একটি করে সিনেমা মুক্তি পায়—‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ ও ‘শেকড়’। আগস্টে মুক্তি পায় ‘বউ নিয়ে যুদ্ধ’ ও ‘ভালোবাসি হয়নি বলা’। আর সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়েছে ‘লাভ ২৬’।

বছরের প্রথম নয় মাসের এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ঢালিউডে সিনেমা মুক্তির কোনো স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা এখনো গড়ে ওঠেনি। ঈদের সময়ে একসঙ্গে অনেক ছবি মুক্তি পেলেও ঈদের বাইরে কোনো কোনো মাসে দর্শক কেবল একটি সিনেমা দেখতে পায়, আবার কোনো মাসে কোনো ছবিই মুক্তি পায় না। মে মাসে আটটি ঈদের সিনেমা একসঙ্গে মুক্তি পাওয়ায় প্রেক্ষাগৃহ ও প্রদর্শনী নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। সে সময় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছিলেন যে, বর্তমান হলসংখ্যা ও বাজারের বাস্তবতায় এতগুলো সিনেমা একসঙ্গে মুক্তি পাওয়ায় কিছু ছবি শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়তে পারে।

তবে এই নয় মাসের হিসাবের মধ্যে কিছু আশার আলোও ছিল, বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের সময়। ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’, ‘দম’, ‘রাক্ষস’ ও ‘প্রেশার কুকার’—এই পাঁচটি সিনেমাই মুক্তির আগে ব্যাপক আলোচনায় ছিল। মুক্তির পর কয়েকটি সিনেমা দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ‘প্রিন্স’ সিঙ্গেল স্ক্রিনে ভালো দর্শক টানতে পেরেছে এবং ‘দম’ মাল্টিপ্লেক্সে উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলেছে। অন্যদিকে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এখন পর্যন্ত বছরের অন্যতম ব্যবসাসফল দেশি সিনেমা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। এই ঈদের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল গল্পের বৈচিত্র্য। রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’ প্রচলিত তারকাকেন্দ্রিক গল্পের বাইরে গিয়ে চার নারীর জীবন, নাগরিক জীবনের চাপ, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত সংগ্রামকে ফুটিয়ে তুলেছে। প্রায় তিন ঘণ্টার এই সিনেমাটিতে ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে চার নারী চরিত্রকে একটি সূত্রে বেঁধেছে পরিচালক। ছবিতে তুষির অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে।

সিনেমা বেশি হলেও সাফল্য এসেছে কম। ঈদুল আজহায় মুক্তি পায় আটটি সিনেমা—আজমান রুশোর ‘রকস্টার’, মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’, মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘বনলতা সেন’, সাইফ চন্দনের ‘মালিক’, সৈকত নাসিরের ‘মাসুদ রানা’, বদিউল আলম খোকনের ‘তছনছ’, ডি এ তায়েবের ‘অফিসার’ ও জাহিদ জুয়েলের ‘পিনিক’। এত দীর্ঘ তালিকা থাকা সত্ত্বেও কোনো একটি সিনেমা ঈদের বাজারে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেনি। মুক্তির আগে প্রচারণা, হলসংখ্যা ও শো-ভাগাভাগি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও ফল আশানুরূপ হয়নি। বিশেষ করে শাকিব খানের ‘রকস্টার’ নিয়ে প্রত্যাশা ছিল সবচেয়ে বেশি। ফার্স্টলুক ও টিজারে চমক দেখালেও মুক্তির পর ছবিটি সেই প্রত্যাশা ধরে রাখতে পারেনি। একইভাবে ‘রইদ’ ও ‘বনলতা সেন’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় থাকলেও ব্যবসায়িক সাফল্যের ক্ষেত্রে বড় কোনো নজির গড়তে পারেনি। ‘মালিক’ ও ‘মাসুদ রানা’ সিনেমার নির্মাণের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।

শাকিব খানের জন্য চলতি বছরটি খুব একটা স্বস্তির নয়। এ বছর তাঁর দুটি সিনেমা ‘প্রিন্স’ ও ‘রকস্টার’ মুক্তি পেয়েছে। দুই ছবির আগেই দর্শকের ব্যাপক আগ্রহ ছিল, কিন্তু আগের কয়েক বছরের ‘প্রিয়তমা’, ‘তুফান’, ‘রাজকুমার’ বা ‘বরবাদ’-এর মতো ব্যবসায়িক সাফল্য এবার আসেনি। ‘রকস্টার’ সিনেমার গানগুলো নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল এবং এতে ১০টি গান ছিল। কয়েকটি গান আলোচনায় এলেও তা সিনেমার সার্বিক ব্যবসায়িক সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে বছরের শেষে শাকিবের জন্য ‘সোলজার’ সিনেমাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ছবিটির শুটিং এখনো শেষ হয়নি। শেষ দশ দিনের শুটিং কবে হবে, তা পরিচালক ও প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার করে জানায়নি। এই কারণে ডিসেম্বরে মুক্তির পরিকল্পনা থাকলেও তা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সিয়াম আহমেদ ও শুভ-মিমের প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। সিয়াম অভিনীত ‘রাক্ষস’ মুক্তির আগেই আলোচনায় ছিল। ‘বরবাদ’ দিয়ে পরিচিতি পাওয়া মেহেদী হাসান হৃদয় পরিচালিত এই ছবিটিতে সিয়ামকে অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে দেখা গেছে। ট্রেলার ও প্রচারে আগ্রহ তৈরি হলেও ব্যবসায়িক সাফল্যের জায়গায় ছবিটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। দীর্ঘ বিরতির পর দেশের প্রেক্ষাগৃহে ফিরেছিলেন আরিফিন শুভ। সাইফ চন্দনের ‘মালিক’ সিনেমায় তাঁর সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন বিদ্যা সিনহা মিম। প্রায় সাত বছর পর এই জুটির ফেরা নিয়ে আগ্রহ থাকলেও মুক্তির পর ছবিটি তেমন আলোচনায় আসেনি।

তবে বাণিজ্যিক ব্যর্থতার পাশাপাশি কিছু ব্যতিক্রমী সিনেমাও ছিল। আকাশ হকের ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ ভিন্ন ধরনের গল্প বলার চেষ্টা করেছে। সিনেমাটিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল-সংস্কৃতি, ছাত্ররাজনীতি, ক্ষমতার সম্পর্ক ও র‍্যাগিংয়ের মতো বিষয় উঠে এসেছে। মুক্তির আগেই ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরামা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছিল এই ছবি। জুলাইয়ে মুক্তি পাওয়া প্রসূন রহমানের ‘শেকড়’ সিনেমাটিও ভিন্নধর্মী গল্পের ছিল। প্রবাসে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শিশুর চোখ দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বাবার জন্মভূমিকে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে এতে।

প্লেব্যাকে গান গাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। এক সময়ের জনপ্রিয় গায়িকা রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমীনকে দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে প্লেব্যাকে পাওয়া গেছে। ‘প্রিন্স’ সিনেমায় রুনা লায়লা গেয়েছেন ‘জ্বালা জ্বালা’। অন্যদিকে ‘দম’ সিনেমায় সাবিনা ইয়াসমীন তাঁর পুরোনো জনপ্রিয় গান ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ নতুন করে গেয়েছেন। ঈদের সিনেমায় এই দুই বরেণ্য শিল্পীর কণ্ঠ ফিরে আসা ছিল বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। এছাড়া আহমেদ হাসান সানি শাকিব খানের ‘রকস্টার’ সিনেমায় সাতটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তবে এত বড় সুযোগ পেলেও গানগুলো তাঁকে প্রত্যাশিত মাত্রায় আলোচনায় আনতে পারেনি। যদিও এ বছর কয়েকটি সিনেমার গান সিনেমার চেয়ে আলাদাভাবে শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।

এখন সবার নজর বছরের শেষ তিন মাসের দিকে। ‘আন্ধার’, ‘সোলজার’ ও ‘সুড়ঙ্গ ২’—বড় তারকা ও বড় প্রত্যাশার এই সিনেমাগুলো মুক্তির কথা ছিল। তবে গত মঙ্গলবার প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘আন্ধার’ সিনেমাটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এটি ২০২৭ সালের মার্চে মুক্তি পাবে। অন্য দুই সিনেমার মুক্তির বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। টিজার প্রকাশ করে ডিসেম্বরে ‘সুড়ঙ্গ ২’ মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হলেও নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া প্রতি মাসেই হুট করে কিছু সিনেমা মুক্তি পায়, যেগুলোতে বড় তারকা বা প্রচার থাকে না। গত কয়েক মাসে এমন কিছু ছবি মুক্তি পেলেও সেগুলো একেবারেই সাড়া ফেলতে পারেনি। তাই আগামী তিন মাসে ঢালিউডের প্রথম নয় মাসের এই মন্দা কাটবে না—এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।