আঙুলের ছাপ মানুষের একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য। আগে মনে করা হতো আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট শুধু মানুষেরই থাকে। অপরাধ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে বায়োমেট্রিক পরিচয়- সবক্ষেত্রেই মানুষের আঙুলের ছাপ কাজে লাগে। কিন্তু আপনি জানেন কি, এই পৃথিবীতে এমন একটি প্রাণী আছে, যার আঙুলের ছাপ মানুষের ছাপের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়? এমনকি অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করলেও এই দুই ছাপ আলাদা করা বিজ্ঞানীদের কাছে রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই বানর বা শিম্পাঞ্জি ভাবতে পারেন। কিন্তু এই প্রাণীটির নাম ‘কোয়ালা’। আমাদের অনেকের কাছেই নামটি অপরিচিত মনে হতে পারে। চলুন এর সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক-
কে এই কোয়ালা?
অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চলে তুলতুলে কান আর গোল গোল নাক নিয়ে গাছে গাছে ঘুরে বেড়ানো এক শান্ত প্রাণী হলো কোয়ালা। এরা তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই গাছের ডালে কাটাতে পছন্দ করে। সরাসরি দেখলে কোয়ালার সঙ্গে মানুষের কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সারাদিন গাছের ডালে ঘুমানো আর অলসভাবে পাতা খাওয়া ছাড়া যেন তাদের আর কোনো কাজই নেই।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন খুব কাছ থেকে এদের হাত খেয়াল করলেন, তখন রীতিমতো অবাক হয়ে গেলেন। মানুষের আঙুলে যেমন ছোট ছোট রেখা বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকে, কোয়ালার হাতের আঙুলেও ঠিক হুবহু তেমন ছাপ আছে।
মানুষের চেয়ে একদম আলাদা একটি প্রাণী, অথচ তার হাতের ছাপ কীভাবে মানুষের সঙ্গে মিলে গেল? এ বিষয়টি বিজ্ঞানীদেরকেও অবাক করে দিয়েছিল।
মানুষের মতো আঙুলের ছাপ কেন?
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে দেখেছেন যে, শিম্প্যাঞ্জি বা বানরজাতীয় প্রাণী ছাড়াও কোয়ালাই একমাত্র ব্যতিক্রমী প্রাণী, যাদের আঙুলে মানুষের মতো সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন থাকে।
দূর থেকে দেখলেও এদের হাতের রেখা মানুষের হাতের রেখার মতো মেনে হয়। বিজ্ঞানীরা যখন প্রথম বিষয়টি লক্ষ্য করেন, তারাও বেশ অবাক হয়েছিলেন। কারণ, বিবর্তনের দিক থেকে কোয়ালারা তো মানুষ বা বানরদের ধারেকাছেও নেই। তবুও প্রকৃতির নিয়মে তাদের হাতে এই অদ্ভুত মিল তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা একে বলেন বিবর্তনের মিল বা ‘কনভার্জেন্ট ইভোলিউশন’। এর মানে হলো, দুটি প্রাণী সম্পূর্ণ আলাদা হলেও যখন একই ধরনের পরিবেশের মুখোমুখি হয়, তখন প্রকৃতি তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য একই রকম সুবিধা তৈরি করে দেয়। যেমন- হাঙ্গর আর ডলফিনের চেহারা প্রায় একই রকম হলেও তারা এক প্রজাতির না। ঠিক তেমনি, কোয়ালারা যখন গাছের সরু ডালে ঝুলে থাকে আর কচি কচি পাতাগুলো ছিঁড়ে খায়, তখন এই হাতের ছাপ তাদের গাছ আঁকড়ে ধরে পাতা ছিঁড়তে সাহায্য করে।
মজার ব্যাপার হলো, কোয়ালার ভাই-ব্রাদার বলা হয় যাদেরকে, যেমন- ক্যাঙ্গারু বা ওম্বাট- তাদের কিন্তু এমন হাতের ছাপ নেই। শুধু কোয়ালারই আছে।
আঙুলের হাতের ছাপের আসল কাজ কী?
আগে সবাই ভাবত আঙুলের ছাপ শুধু কোনো কিছু শক্ত করে ধরার জন্য। কিন্তু পরে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, হাতের এই রেখাগুলো আসলে হাতকে পিচ্ছিল হওয়া থেকে রক্ষা করে।
আমরা যখন কোনো কিছু ধরি, তখন আমাদের হাতের চামড়ার ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে ঘাম বের হয়ে এই রেখাগুলোর ফাঁকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাত অতিরিক্ত শুকিয়েও যায় না, আবার পিচ্ছিলও হয়ে যায় না। এছাড়া কোনো জিনিসের গায়ে হাত দিলে সেটি মসৃণ বা অমসৃণ কি না তা বুঝতেও এই রেখাগুলো সাহায্য করে। ঠিক এই কারণেই কোয়ালারা গাছের ডাল খুব শক্তভাবে মুঠোয় ধরে রাখতে পারে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধায় পড়ে যেতেন
বিষয়টি নিয়ে বেশ মজার কিছু কথাও প্রচলিত আছে। এমন কথাও শোনা গেছে যে, অতীতে অস্ট্রেলিয়ার কোনো অপরাধের জায়গায় যদি কোয়ালার হাতের ছাপ পাওয়া যেত, তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও শুরুতে দ্বিধায় পড়ে যেতেন। যদিও বাস্তবে কোয়ালারা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে এমন ঘটনা হাস্যকর। তবুও মানুষের হাতের ছাপের সঙ্গে তাদের হাতের এই মিল বিজ্ঞানীদের বেশ ভাবিয়েছে।
ল্যাবরেটরিতে যখন মানুষের হাতের ছাপ আর কোয়ালার হাতের ছাপ পাশাপাশি রাখা হয়, তখন খালি চোখে দেখে এই দুটোর মধ্যে তফাত করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
গাছে ওঠা ও সহজে ডাল ধরে রাখার সুবিধা
কোয়ালারা তাদের জীবনের প্রায় পুরোটাই ইউক্যালিপটাস গাছে কাটিয়ে দেয়। গাছের ডাল শক্ত করে আঁকড়ে ধরা, পাতা ছেঁড়া আর এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়ার জন্য তাদের খুব ভালো গ্রিপ বা ধরার ক্ষমতার দরকার হয়।
মানুষের হাত যেভাবে কোনো কিছু শক্ত করে ধরতে সাহায্য করে, ঠিক একইভাবে কোয়ালার হাতের এই বিশেষ ছাপ ও খাঁজগুলো তাদের গাছে চলাফেরা করতে সাহায্য করে। ভেজা বা পিচ্ছিল ডালে যেন হাত ফসকে পড়ে না যায়, আঙুলের এই গঠন তাদের সেই সুরক্ষা দেয়।
জীবনের বিবর্তনের দিক থেকে মানুষ হলো ‘প্রাইমেট’ বর্গের প্রাণী, আর কোয়ালা হলো ‘মারসুপিয়াল’ বা থলিযুক্ত প্রাণী। দুই প্রজাতির বংশধারা ও বৃদ্ধির ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও প্রকৃতির অদ্ভূত নিয়মে এদের মধ্যে এই চমৎকার মিল তৈরি হয়েছে।
প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা এমন ছোট ছোট বিস্ময় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী আরও কত না অজানা তথ্যে ভরা।
তথ্যসূত্র
Earth: Koalas have fingerprints nearly identical to humans
News 18: Which Animal Has Fingerprints Almost Identical To Humans?
TV 9 Bangla