রাতের নিস্তব্ধতায় বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায় অসংখ্য তারা জ্বলছে ও নিভছে। এই বিশাল মহাবিশ্বের নিখুঁত নিয়ম এবং সূক্ষ্ম ভারসাম্য দেখে মনে প্রশ্ন জাগে—এই সবকিছু কি এমনি এমনি তৈরি হয়ে গেল? এই জিজ্ঞাসাটি নতুন নয়। যুগে যুগে বহু মানুষ, এমনকি যারা স্রষ্টায় বিশ্বাস করেননি, তারাও প্রকৃতির এই বিস্ময়কর শৃঙ্খলা দেখে থমকে গেছেন। পবিত্র কোরআনে মানুষকে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে পৃথিবী ঘুরে দেখতে, সৃষ্টিজগতের দিকে তাকাতে এবং গভীরভাবে চিন্তা করতে যে এসবের পেছনে কী সত্য লুকিয়ে আছে।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত-দিনের পরিবর্তনে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০)
১. মানুষের দেহ একটি বিস্ময়: স্রষ্টার প্রমাণ খুঁজতে খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, মানুষের শরীরই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে নিদর্শন। তোমরা কি দেখছ না?’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ২১)
মানুষের হৃৎপিণ্ড কোনো বিরতি ছাড়াই সারা জীবন প্রতিদিন প্রায় এক লাখ বার স্পন্দিত হয়। মস্তিষ্কের প্রায় আশি বিলিয়ন স্নায়ুকোষ প্রতি মুহূর্তে ট্রিলিয়ন সংযোগের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করছে। একটি কোষের ডিএনএ-তে সংরক্ষিত তথ্যের পরিমাণ একটি বিশাল লাইব্রেরির সমান। এই পুরো জটিল ব্যবস্থাপনা প্রতিটি মুহূর্তে নিখুঁতভাবে চলছে, যার কোনো অংশই মানুষের সচেতন নিয়ন্ত্রণে নেই। এত জটিল একটি তন্ত্র দুর্ঘটনাক্রমে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যেকোনো সচেতন মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারে।
২. পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত বস্তুর সূচনা: আধুনিক জীববিজ্ঞানের এক মৌলিক সত্য হলো পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর আমি পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি। তবু কি তারা ইমান আনবে না?’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)
পানির অণুর বিশেষ গঠন—একদিকে ধনাত্মক ও অন্যদিকে ঋণাত্মক চার্জ—একে অসংখ্য জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য উপযুক্ত দ্রাবক হিসেবে কাজ করতে সাহায্য করে। মানবদেহের প্রায় ৬০ শতাংশ পানি এবং কোষের ভেতরের প্রতিটি বিপাকীয় প্রক্রিয়া পানির উপস্থিতি ছাড়া অচল। বিজ্ঞানীরা অন্য গ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা খুঁজতে গেলে প্রথমেই তরল পানির অস্তিত্ব খোঁজেন। দেড় হাজার বছর আগে, যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের ধারণা ছিল না, তখন কোরআনে এই সত্যটি বলা হয়েছে যা আজকের জীববিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় নীতির সাথে মিলে যায়।
৩. সূর্য ও চাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষপথ: আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে সূর্য স্থির নয়, বরং সেটি নিজস্ব কক্ষপথে ছুটে চলছে। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। আর চাঁদের জন্য আমি নির্দিষ্ট মনজিল ঠিক করেছি।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৩৮-৩৯)
সৌরজগৎ মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট গতিপথে প্রদক্ষিণ করছে, যার একটি চক্র সম্পন্ন হতে প্রায় ২২ থেকে ২৩ কোটি বছর সময় লাগে। অন্যদিকে, চাঁদের আকৃতির প্রতি মাসের ২৮টি ধাপ এতটাই সুনির্দিষ্ট যে এর ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্যালেন্ডারগুলো তৈরি হয়েছে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণের আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকা সময়েই কোরআনে এই গাণিতিক শৃঙ্খলার কথা বলা হয়েছে।
৪. সমুদ্রের দুই স্রোতের মাঝে অদৃশ্য বাধা: সমুদ্রবিজ্ঞানে 'হ্যালোক্লাইন' নামক একটি ঘটনা দেখা যায়, যেখানে ভিন্ন লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের দুটি জলরাশি পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েও একটি অদৃশ্য সীমারেখা বজায় রাখে। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তিনি দুটি সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। তাদের মাঝে আছে এক অন্তরায়, যা তারা অতিক্রম করে না।’ (সুরা রহমান, আয়াত: ১৯-২০)
জিব্রাল্টার প্রণালির মতো স্থানে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের পানি মিলিত হলেও ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে তারা সহজে মিশে যায় না এবং দীর্ঘ দূরত্বজুড়ে আলাদা স্তরে প্রবাহিত হয়। বিজ্ঞান অনেক পরে এই রহস্য উন্মোচন করলেও কোরআন হাজার বছর আগেই এই তথ্য প্রদান করেছে।
৫. মানুষের সৃষ্টির পর্যায়ক্রমিক বিবরণ: আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান মানব ভ্রূণের বিকাশকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর তাকে শুক্রবিন্দু হিসেবে এক সুরক্ষিত স্থানে রেখেছি। তারপর শুক্রবিন্দুকে রূপান্তরিত করেছি রক্তপিণ্ডে, রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ডে, মাংসপিণ্ড থেকে তৈরি করেছি হাড়, তারপর হাড়কে মাংস দিয়ে ঢেকে দিয়েছি।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১২-১৪)
ভ্রূণের শুরুতে নিষিক্ত ডিম্বাণু, তারপর জরায়ুর দেয়ালে আটকে থাকা জোঁকের মতো কোষে রূপান্তর, এরপর চিবানো মাংসের মতো পিণ্ড, তারপর ভেতরে হাড়ের কাঠামো তৈরি এবং সবশেষে মাংসপেশির আবরণ তৈরি হয়। আলট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি ছাড়া এই স্তরগুলো দেখা সম্ভব ছিল না। দেড় হাজার বছর আগে এই নিখুঁত বিবরণ কীভাবে দেওয়া সম্ভব হলো, তা চিন্তাশীল মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।
৬. বায়ুর মাধ্যমে পরাগায়ন: ঘাসজাতীয় ফসল ও কনিফার গাছের মতো বহু উদ্ভিদ বংশবিস্তারের জন্য বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। বাতাস পরাগরেণু এক ফুল থেকে অন্য ফুলে বহন করে নিয়ে যায়, যাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে 'অ্যানিমোফিলি' বলা হয়। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর আমি বায়ু পাঠাই পরাগায়নকারী হিসেবে। তারপর আকাশ থেকে পানি নাজিল করি এবং তোমাদের তা পান করাই।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ২২)
এমনকি সমুদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস লবণকণা তুলে নিয়ে মেঘে পরিণত করে, যা পরে বৃষ্টি হয়ে নামে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি খালি চোখে দেখা যায় না, তবে কোরআনে বায়ু, পরাগায়ন ও বৃষ্টির মধ্যকার এই সংযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. মৌমাছির প্রতি প্রত্যাদেশ: মৌচাকের ষড়ভুজাকার কুঠুরিগুলো গাণিতিকভাবে সবচেয়ে কম মোম ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি মধু সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর কাঠামো, যা গণিতবিদেরা বহু শতাব্দী পরে প্রমাণ করেছেন। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর তোমার রব মৌমাছিকে ওহি করলেন, পাহাড়ে, গাছে ও মানুষের তৈরি কাঠামোয় তুমি ঘর তৈরি করো। তাদের পেট থেকে বের হয় বিভিন্ন রঙের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৬৮-৬৯)
মৌমাছিরা বিশেষ নাচের মাধ্যমে একে অপরকে খাবারের দিকনির্দেশনা দেয়, যার জন্য বিজ্ঞানী কার্ল ফন ফ্রিশ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। মধুর প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদানের কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যবহার প্রচলিত। একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের এত জটিল আচরণ ও উৎপাদন কোনোভাবেই কাকতালীয় হতে পারে না; এর পেছনে রয়েছে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ও আদেশ।
৮. আঙুলের ছাপের অনন্যতা: প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ আলাদা, এমনকি যমজ ভাইবোনের ক্ষেত্রেও। গর্ভাবস্থার প্রায় ২৪ সপ্তাহের মধ্যে জিন এবং গর্ভফুলের ভেতরের তরলের চাপের তারতম্যের মাধ্যমে এই ছাপ তৈরি হয়। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে আমি তার হাড়গুলো একত্র করব না? হ্যাঁ, আমি তার আঙুলের ডগাগুলো পর্যন্ত নিখুঁতভাবে সাজিয়ে দিতে সক্ষম।’ (সুরা কিয়ামা, আয়াত: ৩-৪)
বিংশ শতাব্দীতে ফরেনসিক বিজ্ঞান এই অনন্যতা আবিষ্কার করে এবং এটি মানুষ শনাক্তকরণের নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে পরিণত হয়। পুনরুত্থানের প্রসঙ্গে আল্লাহ ঠিক এই সূক্ষ্মতম অংশটির কথা উল্লেখ করেছেন, যা বিজ্ঞানের চোখে অনেক পরে ধরা পড়েছে।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করো, আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তা করো না, কারণ, তোমরা তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারবে না।’ (আস-সিলসিলাতুস সহিহা, আলবানি, হাদিস: ১৭৮৮)
আজ রাতে একবার আকাশের দিকে তাকান, নিজের হাতের আঙুলের রেখাগুলোর দিকে অথবা জানালার পাশে ফুটে থাকা কোনো ফুলের দিকে, যেখানে হয়তো একটি মৌমাছি উড়ছে। এই প্রতিটি দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য নিখুঁত পরিকল্পনা। মহানবী (সা.) রাতের নির্জনতায় আসমান-জমিনের এই নিদর্শনগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। সেই আকাশ এবং নিদর্শনগুলো আজও আমাদের সামনে ছড়িয়ে আছে; প্রয়োজন শুধু একবার থেমে তাকানো এবং গভীরভাবে চিন্তা করা।
—মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়