মা ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে জেলেদের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তাঁদের সংসার চলবে কীভাবে, সেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সময়মতো নিশ্চিত করা হয়নি। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে নিষেধাজ্ঞার ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও জেলেরা এখনো প্রতিশ্রুত খাদ্যসহায়তা পাননি। ইলিশ সংরক্ষণের গুরুদায়িত্ব জেলেদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাঁদের জীবিকার সংকটকে এভাবে উপেক্ষা করা মোটেই ন্যায়সংগত নয়।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা রয়েছে। সন্দ্বীপে কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৮ হাজার ৩৩২ জন হলেও সহায়তা পাবেন মাত্র ৪ হাজার জন। এর অর্থ হলো, কার্ড থাকা সত্ত্বেও অর্ধেকের বেশি জেলে এই সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি যারা প্রকৃত জেলে হওয়া সত্ত্বেও কার্ড পাননি, তাঁদের করুণ পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে। ফলে সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্বের পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ার আওতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

যারা প্রতিদিন মাছ ধরে জীবনধারণ করেন, তাঁদের জন্য টানা তিন সপ্তাহ আয়হীন থাকা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। কেবল খাবার কেনাই নয়, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং সংসারের অন্যান্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যয় মেটানো তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২৫ কেজি চাল দিয়ে এই সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়, তবে চরম অভাবের সময়ে এই সামান্য সহায়তাটুকুও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সহায়তা যদি নিষেধাজ্ঞার শেষভাগে পৌঁছায়, তবে পূর্ববর্তী দিনগুলোতে পরিবারগুলোকে ধারদেনা করে অথবা খাবার কমিয়ে জীবন কাটাতে হয়। এতে করে সরকারি সহায়তার মূল উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যাহত হয়।

উপজেলা প্রশাসন দাবি করেছে যে, চাল এলাকায় পৌঁছেছে, কিন্তু দুর্গাপূজার ছুটির কারণে তা বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এই ব্যাখ্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিষেধাজ্ঞার সময়সূচি এবং সরকারি ছুটির কথা আগে থেকেই জানা ছিল। তাহলে সেই অনুযায়ী বিতরণের প্রস্তুতি নেওয়া হলো না কেন? জরুরি জীবিকা-সহায়তা যেন ছুটির কারণে আটকে না থাকে, সেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রশাসনেরই দায়িত্ব। চাল গুদামে বা বিতরণকেন্দ্রে পৌঁছানো আর ক্ষুধার্ত পরিবারের হাতে পৌঁছানো এক কথা নয়।

সহায়তাবঞ্চিত জেলেদের এই চরম দুরবস্থার সুযোগে সন্দ্বীপের কয়েকটি ঘাটে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে জাটকা মাছও ধরা পড়ছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু অভিযান ও জরিমানা করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন, যদি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার মতো ন্যূনতম আর্থিক সামর্থ্য জেলেদের না থাকে। তাই জীবিকার সুরক্ষা এবং মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণকে একই পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

মৎস্য বিভাগের পরিচালিত ২৩টি অভিযানের মধ্যে ২১টিতেই কাউকে আটক করা যায়নি কিংবা কোনো ইলিশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাই স্থানীয় তথ্যের সঠিক ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের তালিকা দ্রুত হালনাগাদ করে কার্ড প্রদান ও সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। সহায়তার সীমিত বরাদ্দের কারণে যোগ্য জেলেরা কেন বাদ পড়ছেন, তার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। অবিলম্বে বরাদ্দের চাল বিতরণ করতে হবে এবং বঞ্চিত জেলেদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই যেন সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।