রাজধানীর বাজারে বর্তমানে হীরা-মুক্তার চেয়েও বেশি আলোচিত ও চাহিদাসম্পন্ন আইটেম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘রায়ট কার’ বা সাঁজোয়া যান। এক হাজার পিস রায়ট কার কেনার এক বিশাল হিড়িক শুরু হয়েছে, যেখানে প্রতিটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সোয়া দুই কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের কথা শুনে সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দন বাড়লেও নীতিনির্ধারকদের বাজেটে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। ফলে বেশ আয়েশ করেই এগিয়ে চলছে এই মেগা প্রজেক্ট।

এই গাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো শুনলে যেকোনো সচেতন নাগরিকের চোখ কপালে উঠবে। এতে রয়েছে বুলেটপ্রুফ গ্লাস এবং বিশেষ এয়ারকন্ডিশন ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে এক অনন্য ‘জনতা তাড়ানো’ হর্ন। দাবি করা হচ্ছে, এই হর্ন বাজলেই মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সব উত্তেজনা ভুলে সোজা বাড়ি গিয়ে মায়ের হাতের গরম খিচুড়ি খাওয়ার বায়না ধরবে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এই গাড়ির উপস্থিতিতেই মানুষের মাথা ঠান্ডা হয়ে মুখে এক ধরনের মায়াবী হাসি ফুটে ওঠে। এর পেছনে রয়েছে গাড়ির বিশেষ রঙের কারসাজি, যা দেখলেই মানুষের মনে শান্তি নেমে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, সরকার এই আইডিয়াটি সম্ভবত ‘The Perfume’ সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিয়েছে; তবে সেখানে পারফিউমের বদলে এবার ব্যবহৃত হবে রায়ট কার।

তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার আসল টুইস্ট লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। এই সাঁজোয়া যানগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিল বা সভা ঠেকানোর জন্য কেনা হয়নি, বরং এগুলো আনা হয়েছে আমাদের নিত্যদিনের প্রকৃত জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য। সরকারের উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ। বর্তমানে দেশে যেকোনো অজুহাতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ফুটপাতের বাদাম বিক্রেতা থেকে শুরু করে পিএইচডি ডিগ্রিধারী বেকার যুবক—সবাই রাজপথ গরম রাখতে ব্যস্ত। সরকারের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অতিরিক্ত চাপে রাজপথের পিচ নষ্ট হয়ে যাবে। তাই দেশের রাস্তা, পিচ এবং নাগরিকদের ধৈর্য—সবকিছু রক্ষা করতেই এই গাড়িগুলোর আমদানি করা হচ্ছে।

গাড়ির রঙের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে আধুনিক নান্দনিক ছোঁয়া। গতানুগতিক কালো বা জলপাই রঙের পরিবর্তে গাড়িগুলো রাঙানো হয়েছে আকর্ষণীয় গোলাপি এবং বেবি ব্লু রঙে। এর ফলে মারামারি বা ধস্তাধস্তির সময়ও যেন এক ধরনের ফ্যাশনেবল বাটিক প্রিন্টের আমেজ পাওয়া যায়। এই পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের নেতারা ব্যঙ্গ করে বলেছেন, “সরকার আসলে দাঙ্গা দমন করতে চায় না, তারা দেশের কার মার্কেটে একধরনের বিলাসবহুল বিপ্লব ঘটাতে চায়!”

পুনরায় উল্লেখ্য যে, এই গাড়িগুলো রাজনৈতিক সংঘাতের জন্য নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো সংঘর্ষ সামলাতেই ব্যবহৃত হবে। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সময় অফিসগামী যাত্রীরা যখন সিএনজি বা বাসের চালকের সঙ্গে মিটারে না যাওয়া নিয়ে হাতাহাতিতে জড়ান, অথবা ট্রাফিক জ্যামে দুই বাসের কন্ডাক্টরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ঝগড়া শুরু হয়—ঠিক সেই মুহূর্তেই মাঠে নামবে এই রায়ট কার। কারণ, দেশের প্রকৃত বড় দাঙ্গাগুলো কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে হয় না। দাঙ্গা হয় কাওরান বাজারে ইলিশ মাছের দাম নিয়ে, কিংবা ২৫০ গ্রাম কাঁচা মরিচ বেশি চাওয়া নিয়ে। এমনকি ফুটপাতে ফুচকার প্লেটে টক কম দেওয়া নিয়েও দাঙ্গা হয়।

সবচেয়ে ভয়ংকর সংঘর্ষটি দেখা যায় ধানমন্ডি লেকের পাড়ে—যখন প্রেমিক-প্রেমিকা মিলে ফুচকাওয়ালাকে বলে, “ভাই, টকটা একটু বেশি দেন।” জবাবে ফুচকাওয়ালা বলে, “আপা, বেশি টক দিলে পেটের সমস্যা হবে।” এই কথা শুনে প্রেমিক পাল্টা প্রশ্ন করে, “আপনি জানেন আমি কে?” ফুচকাওয়ালা যখন উত্তরে বলে, “না”, তখনই পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে রায়ট কারের হর্ন বাজবে। ফলে প্রেমিক-প্রেমিকা, ফুচকাওয়ালা এবং পথচারী—সবাই শান্ত হয়ে যাবে। ফুচকা নিয়ে আর কোনো কথা হবে না। সবাই মিলে রায়ট কারের গোলাপি রঙ দেখে মুগ্ধ হয়ে ছবি তুলবে এবং ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবে— “আজ ধানমন্ডিতে অসাধারণ একটা গাড়ি দেখলাম। দেশের উন্নয়ন চোখে দেখা যাচ্ছে!”

এভাবেই একদিন দেশের সব দাঙ্গা শেষ হয়ে যাবে। রাজপথে আর কোনো মিছিল থাকবে না, থাকবে শুধু রায়ট কার। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে এক হাতে ফুচকা ও অন্য হাতে মোবাইল নিয়ে জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে সেলফি তুলবে।