রাজধানীর গুলশান এলাকায় ‘কিংফিশার’ নামক একটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ ও বিয়ার উদ্ধার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের চারটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে মোট ২ হাজার ৩৫৯ লিটার মদ ও বিয়ার জব্দ করা হয়েছে।

রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হওয়া এই অভিযান প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে। অভিযানে দেখা যায়, রেস্তোরাঁটির প্রদর্শনী এলাকা এবং গুদামের পাশাপাশি একটি বিলবোর্ডের আড়ালে অত্যন্ত গোপনে একটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। সেই গোপন কক্ষ থেকেই রেজিস্ট্রারে নথিভুক্ত নয় এমন বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও বিয়ার উদ্ধার করা হয়।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ বক্তব্য প্রদান করেন। এসময় মূল্য সংযোজন কর (মূসক) এবং কর গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

অভিযানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে রেজভী আহম্মেদ বলেন, “অভিযানের সময় পোষা প্রাণী দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়। ক্রেতার তুলনায় সেখানে শেলফে রাখা মদ ছিল কম। কিন্তু সন্দেহ হওয়ায় বিলবোর্ড খোলা হয়। সেখানকার গোপন কক্ষের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অসহযোগিতা করা হয়। কক্ষের দরজার চাবি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। তবে অভিযানে বাধা দেওয়া হয়নি। তাই কাউকে আটক করা হয়নি। তবে তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয় যে, উচ্চ শুল্ক আরোপযোগ্য পণ্য, বিশেষ করে মদ ও মদজাতীয় পানীয় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সংগ্রহ ও বিক্রি করা হচ্ছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই অভিযানটি চালানো হয়। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পণ্যের বৈধ উৎস যাচাই করা, বিক্রির ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকি দেওয়া হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা, বিক্রয়লব্ধ অর্থ আয়কর নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না এবং লেনদেনের মাধ্যমে কোনো অর্থ পাচারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা।

কাস্টমস গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৮২৬ লিটার মদ এবং দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের ১ হাজার ৫৩৩ লিটার বিয়ার জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে শিভাস রিগ্যাল, ব্ল্যাক লেবেল, রেড লেবেল, জ্যাক ড্যানিয়েলস, গোল্ড লেবেল, গর্ডনস জিন ও অ্যাবসলিউট ভদকা অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া হান্টার ও হাইনেকেনসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিয়ার পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জব্দ করা এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ৯১ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। তবে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর যুক্ত করলে এগুলোর মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ২ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এনবিআর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি মদ আমদানিকারক হিসেবে নিবন্ধিত নয় এবং অভিযানের সময় তারা দেশি-বিদেশি মদ ও বিয়ার কেনাবেচার কোনো বৈধ চালান বা নথি দেখাতে পারেনি।

এই যৌথ অভিযানে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, মূল্য সংযোজন কর নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। অভিযানে নিরাপত্তা সহায়তার দায়িত্ব পালন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-১) সদস্যরা। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির চারজন পরিচালকের তথ্য বর্তমানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে এসআরবি-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম খান রাতে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অভিযানে অংশ নেওয়া সরকারি সংস্থার সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসআরবি-১-এর একটি দল অংশ নিয়েছিল।”

অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান রাতে মুক্তকণ্ঠকে জানান, এ ঘটনায় গুলশান থানায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।