ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত টেস্ট সিরিজ শুরুর আর মাত্র দুই দিন বাকি। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতির চেয়ে মাঠের বাইরের নানা ঘটনাপ্রবাহ বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে। ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব থেকে মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে দেওয়া, সম্প্রতি ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজে দলের ব্যর্থতা এবং বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে ক্রিকেটারদের বিশেষ বৈঠক—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে এসব অস্থিরতা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স। তার দৃষ্টিতে মাঠের বাইরের পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সিরিজের প্রস্তুতি। অস্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উল্টো সাংবাদিকদের কাছেই জানতে চাইলেন, ম্যাচের আগে এমন ঘটনা কি এই প্রথম ঘটছে?
সোমবার (২৬ অক্টোবর) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন সিমন্স। আগামী বুধবার এই মাঠেই শুরু হতে যাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। এই গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে জাতীয় দলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে ক্যারিবীয় এই কোচ জবাব দেন, ‘আপনারা আমার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আছেন। বিশ্ব ক্রিকেটও অনেক বেশি দিন ধরে দেখছেন। ম্যাচের আগে এমন বিশৃঙ্খলা কি এবারই প্রথম হচ্ছে? না, তাই তো? প্রতিটি সিরিজই গুরুত্বপূর্ণ। আসল বিষয় হলো, আমরা নিজেদের কাজ কীভাবে করছি এবং সিরিজের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
উল্লেখ্য, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের মাত্র চার দিন আগে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আশরাফুলকে। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিসিবি এই সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। বোর্ড থেকে বলা হয়েছে, সাবেক এই অধিনায়ককে অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া হবে। আপাতত ব্যাটিং বিভাগের দায়িত্ব পালন করবেন বিসিবির হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের প্রধান কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন।
এর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজে দুই ম্যাচ হেরে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আশরাফুলকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অন্যায্য কি না, তা জানতে চাওয়া হলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সিমন্স। বাংলাদেশ কোচের সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল, ‘আমার মনে হয় না, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার কাজ।’
এদিকে রোববার জাতীয় দলের পাঁচ ক্রিকেটার এবং টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফিল সিমন্সও। তবে তার দাবি, এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু কোনো নির্দিষ্ট সিরিজ কিংবা সাম্প্রতিক ব্যর্থতা ছিল না। সিমন্স বলেন, ‘আমি বৈঠকে ছিলাম। সেখানে মূলত বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। তরুণ ক্রিকেটারদের কীভাবে গড়ে তোলা যায়, তা নিয়েও কথা হয়েছে। খুব ভালো একটি বৈঠক ছিল। এটি নির্দিষ্ট কোনো সিরিজ নিয়ে ছিল না। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতির বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে।’
মাঠের বাইরের এসব ঘটনা দলের প্রস্তুতিতে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, সেই প্রশ্নেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন কোচ। তার মতে, গত কয়েক দিনে অনুশীলনে থাকা ক্রিকেটাররা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেদের কাজ করেছেন। এমনকি তামিম ইকবালের সঙ্গে বৈঠকটিকেও তিনি প্রস্তুতির পথে বাধা হিসেবে দেখছেন না। সিমন্স বলেন, ‘গত তিন-চার দিন যারা এখানে ছিল, তারা খুব ভালোভাবে অনুশীলন করেছে। এখন পুরো দল একসঙ্গে হচ্ছে। সামনের দুই দিনে আমরা কী করছি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের বাইরে কী ঘটছে, সেটি নয়। দল হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করাই আমাদের কাজ।’
তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের আগে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি বলে স্বীকার করেছেন সিমন্স। ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজে টেস্ট দলের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ব্যস্ত থাকায় পুরো দলকে একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা পুরো দলকে একসঙ্গে পাইনি। কারণ তখন ত্রিদেশীয় সিরিজ চলছিল। ওয়ানডে ও টেস্ট দুই সংস্করণেই খেলে এমন কয়েকজন ক্রিকেটার সেখানে ছিল। এটা আদর্শ পরিস্থিতি নয়। তবে তারা বসে ছিল না, ক্রিকেট খেলেছে। এখন পুরো দলকে একসঙ্গে প্রস্তুত করার জন্য আমাদের হাতে দুই দিন আছে।’
আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ড্র হওয়া টেস্ট ম্যাচটি নিয়েও কথা বলেন সিমন্স। সেই ম্যাচে ৪৭৯ রানের লক্ষ্য দিয়ে শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল সাত উইকেট। তবে তারা মাত্র পাঁচটি উইকেট নিতে সক্ষম হয়। ফলে আফগানিস্তান ৩৪৬ রানে আট উইকেট হারিয়ে ম্যাচটি ড্র করে। দলের খেলার ধরনে বড় কোনো ভুল দেখছেন না সিমন্স। বরং ফিল্ডিংয়ের ব্যর্থতার কারণেই জয় হাতছাড়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ কোচ বলেন, ‘আমার মনে হয় না, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ছেলেরা ভুলভাবে খেলেছে। আমরা যেভাবে খেলতে চেয়েছিলাম, তারা সেভাবেই খেলেছে। শেষ দিনে উইকেট আমাদের ধারণার চেয়ে ভালো ছিল। রানআউটের সুযোগ নষ্ট করেছি, কয়েকটি ক্যাচও ফেলেছি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি আমাদের জেতা উচিত ছিল।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লড়াই হবে কঠিন, এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সিমন্স। সাম্প্রতিক দুটি টেস্ট সিরিজে ক্যারিবীয় দল বেশ ভালো খেলেছে। এছাড়া ভারত সফরে সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও তাদের পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে বাংলাদেশ কোচের। তাই প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি। সিমন্স বলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের সর্বশেষ দুটি টেস্ট সিরিজে ভালো খেলেছে। ভারতেও দুর্দান্ত ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলেছে। তাই আমাদের কঠিন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’
প্রথম টেস্টের আগে লিটন দাসের ফিটনেস নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও সিমন্স জানিয়েছেন, আপাতত এই ব্যাটারকে খেলার জন্য প্রস্তুত বলেই তিনি জানেন। আগামী দুই দিনে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হলে তা জানানো হবে।
অন্যদিকে, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বাংলাদেশ দলকে বাড়তি অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। বর্তমানে পয়েন্ট তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। চলতি চক্রে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচসহ আরও ছয়টি টেস্ট বাকি নাজমুল হোসেন শান্তর দলের। ঘরের মাঠে ক্যারিবীয়দের হারিয়ে ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল করতে চায় তারা। সিমন্স বলেন, ‘সবাই টেস্ট ম্যাচের দিকেই মনোযোগী। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা সবার মধ্যে রয়েছে। এই প্রথম আমরা এমন অবস্থানে পৌঁছেছি, যেখান থেকে ফাইনালে খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই আমার বিশ্বাস, সবাই ম্যাচের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবে।’