এক সময় বলিউডের রুপালি পর্দায় নিয়মিত উপস্থিতি ছিল তাঁর। আমির খানের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করে রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছিলেন তিনি। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ থেকে বলিউডে এসে খুব দ্রুতই নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন অসিন। তবে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে থাকা অবস্থাতেই অভিনয় জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বর্তমানে আর কোনো নতুন সিনেমায় তাঁকে দেখা যায় না, এমনকি বিনোদন জগতের নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা থেকেও তিনি দূরে। তাহলে কোথায় হারিয়ে গেলেন একসময়ের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী? বর্তমানে তিনি কী করছেন, কেমন কাটছে তাঁর দাম্পত্য জীবন এবং অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি কত সম্পদের মালিক হয়েছেন—তা নিয়ে অনেকের মনেই কৌতূহল রয়েছে।
আগামী ২৬ অক্টোবর অসিনের জন্মদিন। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে ফিরে দেখা যাক তাঁর ক্যারিয়ার, প্রেম-বিয়ে, সংসার এবং বর্তমান জীবনযাত্রার কথা।
দক্ষিণের সিনেমা থেকে বলিউডের তারকা
১৯৮৫ সালের ২৬ অক্টোবর ভারতের কেরালার কোচিতে জন্ম অসিন থোট্টুমকলের। তাঁর বাবা জোসেফ থোট্টুমকল ছিলেন সিবিআই-এর একজন সাবেক কর্মকর্তা এবং মা সেলিন একজন চিকিৎসক। শৈশব থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ ও অভিনয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা অসিন কৈশোরেই অভিনয়ের হাতেখড়ি দেন। ২০০১ সালে মালয়ালম ছবি ‘নরেন্দ্রন মাকান জয়কান্তন ভাকা’র মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় অসিনের। তবে প্রকৃত পরিচিতি আসে তেলেগু ছবি ‘আম্মা নান্না ও তামিলা আম্মাই’র মাধ্যমে। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটি তাঁকে দক্ষিণ ভারতের দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর তামিল সিনেমাতেও নিজের অবস্থান মজবুত করেন তিনি। ‘এম কুমারান সন অব মহালক্ষ্মী’, ‘গজনি’, ‘সিভাকাসি’, ‘পোক্কিরি’ ও ‘দশাবতারম’—একের পর এক সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার প্রথম সারির নায়িকাদের একজন হয়ে ওঠেন অসিন। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর নাচ এবং পর্দায় সাবলীল উপস্থিতি তাঁকে আলাদা এক পরিচিতি দিয়েছিল।
২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া তামিল ‘গজনি’তে সুরিয়ার বিপরীতে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। এই ছবির হিন্দি সংস্করণেই পরবর্তীতে আমির খানের নায়িকা হিসেবে বলিউডে তাঁর অভিষেক ঘটে।
আমির খানের নায়িকা, প্রথম ১০০ কোটি রুপির মাইলফলক
২০০৮ সালে মুক্তি পায় এ আর মুরুগাদস পরিচালিত ‘গজনি’র হিন্দি সংস্করণ। আমির খানের বিপরীতে কল্পনা শেঠি চরিত্রে অভিনয় করেন অসিন। ছবিটি কেবল বক্স অফিসেই সাফল্য পায়নি, বরং হিন্দি সিনেমার বাণিজ্যিক ইতিহাসেও তৈরি করেছিল এক নতুন মাইলফলক। ভারতে প্রথম ১০০ কোটি রুপি নিট আয় করা হিন্দি ছবি হিসেবে পরিচিতি পায় এই সিনেমাটি।
আমিরের সঙ্গে অসিনের রসায়ন দর্শকদের মন জয় করেছিল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সালমান খানের সঙ্গে ‘রেডি’ ও ‘লন্ডন ড্রিমস’, অক্ষয় কুমারের সঙ্গে ‘হাউসফুল ২’ ও ‘খিলাড়ি ৭৮৬’, এবং অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে ‘বোল বচ্চন’—বাণিজ্যিকভাবে সফল বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন অসিন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বলিউডের প্রতিষ্ঠিত নায়িকাদের কাতারে জায়গা করে নেন তিনি।
তবে অসিনের অভিনয়জীবন খুব দীর্ঘ হয়নি। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অল ইজ ওয়েল’ ছিল তাঁর শেষ ছবি। সেই সময়েও বলিউডে তাঁর ব্যাপক চাহিদা ছিল এবং সামনে আরও কাজ করার প্রচুর সুযোগ ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
হঠাৎ অভিনয় ছেড়ে সংসারী
২০১৬ সালে ব্যবসায়ী রাহুল শর্মাকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর অভিনয়ে ফেরার কোনো তাড়াহুড়ো দেখাননি তিনি। ধীরে ধীরে সামাজিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্রের প্রচার এবং বিনোদনজগতের নিয়মিত উপস্থিতি থেকেও দূরে সরে যান তিনি।
রাহুল শর্মা ভারতের প্রযুক্তি ও ব্যবসাজগতের একজন পরিচিত উদ্যোক্তা। তিনি মুঠোফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোম্যাক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা। একসময় ভারতীয় বাজারে দেশীয় মোবাইল ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে মাইক্রোম্যাক্স ছিল অন্যতম শক্তিশালী নাম।
২০০০ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে মুঠোফোনের বাজারে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে ফিচারসমৃদ্ধ ফোন বাজারে এনে নকিয়া ও স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছিল তারা। একপর্যায়ে বিশ্ববাজারেও উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করে মাইক্রোম্যাক্স।
তবে স্মার্টফোনের বাজারে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর উত্থান এবং প্রতিযোগিতার ধরন পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির আগের দাপট কমে যায়। রাহুল পরবর্তীতে অন্য ব্যবসায় মনোযোগ দেন। তাঁর বর্তমান উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের ব্যবসা।
অসিন ও রাহুলের পরিচয়ের পেছনে বলিউডের আরেক তারকা অক্ষয় কুমারের ভূমিকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অক্ষয়ের সঙ্গে অসিনের কাজের সূত্রে তাঁদের পরিচয় হয় বলে জানা যায়। পরবর্তীতে সেই পরিচয় প্রেমে রূপ নেয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করেন তাঁরা। বিয়ের পর অসিন নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখলেও রাহুল মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করেছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দশম বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে রাহুল তাঁদের বিয়ের কিছু অপ্রকাশিত ছবি ভাগ করে নেন। স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর আবেগঘন বার্তাও আলোচনায় আসে। তিনি অসিনকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুর সহযাত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের সম্পর্ক যে শুধু তারকা ও ব্যবসায়ীর দাম্পত্য নয়, বরং ব্যক্তিগত জীবনে পারস্পরিক সমর্থনেরও জায়গা—সেই বার্তাই ছিল পোস্টটিতে।
মেয়ে আরিনকে নিয়ে সংসার
২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর কন্যাসন্তানের মা হন অসিন। মেয়ের নাম রাখা হয় আরিন রায়ন শর্মা। এর পর থেকেই পরিবারকে ঘিরে অসিনের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আগের মতো সক্রিয় নন। মেয়েকে নিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু ছবি প্রকাশ পেলেও পরিবারের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানান না তিনি। ২০২৬ সালের আগস্টে তাঁদের মেয়েকে ঘিরে ওনাম উদ্যাপনের কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। ছবিগুলোতে পারিবারিক উৎসবের মুহূর্ত দেখা গেলেও অসিনের জীবনযাপনের বেশির ভাগ অংশ এখনো ব্যক্তিগতই রয়ে গেছে।
কত সম্পদের মালিক অসিন ও তাঁর স্বামী
অসিনের স্বামী রাহুল শর্মার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি রুপি বা ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
দিল্লির দক্ষিণাঞ্চলের মেহরৌলিতে তাঁদের একটি বড় খামারবাড়ি রয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পত্তিটির মূল্য ৮০ কোটি রুপি বা তার বেশি হতে পারে।
ইন্ডিয়া টুডে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে