মানিকগঞ্জের সদর উপজেলার দীঘি ইউনিয়নের ভাটবাউর গ্রামে এক পরিবারের চার ভাই-বোনের জীবন অতি কষ্টের। আট ভাই-বোনের মধ্যে চারজন খর্বাকৃতির বা বেঁটে। তাঁদের মধ্যে দুই ভাই কিছুটা হাঁটাচলা করতে পারলেও দুই বোন একেবারেই দাঁড়াতে পারেন না। ফলে দৈনন্দিন সব কাজ এবং খাওয়াদাওয়া করতে তাঁদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। উপরন্তু, বাড়িতে যাতায়াতের কোনো রাস্তা না থাকায় তাঁদের দুর্ভোগ এখন আরও চরমে পৌঁছেছে।

তাঁরা মৃত হযরত আলী ও জহুরা বেগমের সন্তান। এই দম্পতির মোট আট সন্তানের মধ্যে পাঁচ মেয়ে ও তিন ছেলে। খর্বাকৃতির চার সন্তান হলেন মোছা. হাবিয়া (৬৪), মোছা. মেহেরজান (৫৮), ইজ্জত আলী (৫২) ও সিরাজ আলী (৪৮)। পরিবারের সুস্থ চার সদস্য হলেন ছবিয়া বেগম (৬১), আফেলা বেগম (৫৫), লিটন মিয়া (৪৬) ও দাপালি বেগম (৪২)।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাঁদের বাবা হযরত আলী বিআইডব্লিউটিসির একজন কর্মচারী ছিলেন, যিনি প্রায় ১০ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদের মধ্যে কেবল ইজ্জত আলী বিবাহিত, বাকি তিনজনের বিয়ে হয়নি। তাঁরা সবাই একই বাড়িতে বসবাস করছেন। জহুরা বেগম সুস্থ চার সন্তানের মধ্যে তিন মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে জহুরা বেগমের সংসারে প্রতিবন্ধী চার সন্তান ও এক ছেলেসহ মোট পাঁচজন সদস্যের পাশাপাশি দুই ছেলের বউ এবং দুই নাতি রয়েছেন।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, তাঁরা জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী ছিলেন না। শৈশবে হঠাৎ শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। সন্তানদের এই শারীরিক গঠন সম্পর্কে জহুরা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রথম সন্তান হাবিয়ার বয়স যখন সাত, তখন তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বর সেরে যাওয়ার কয়েক দিন পর হাঁটার সময় হাবিয়াকে অস্বাভাবিক মনে হয়। পরে কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করিয়েও হাবিয়া সুস্থ হয়ে ওঠেননি।” তিনি আরও জানান, অন্য তিন সন্তানের ক্ষেত্রেও সাত থেকে আট বছর বয়সে হঠাৎ অসুস্থতার পর হাঁটার সমস্যা শুরু হয়। এর ফলে দুজনের হাঁটাচলাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। সন্তানদের এই শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রামের মানুষের কটূক্তি সহ্য করতে হয় জহুরা বেগমকে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “বাড়ির বাইরে বের হইলে মাইনষে কত ঠাট্টার কথা কইছে! এহনও করে।”

প্রতিবন্ধী মেহেরজান তাঁর কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “আমাগো কষ্টের জীবনের খোঁজ কেউ নেন না। প্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারের বোঝা মনে হয়। হুইলচেয়ারে করে কেউ বের করবে, হেই রাস্তাও নাই। আমাগো কষ্ট নানা দিকে।”

ভাটবাউর বাজারের পাকা সড়কের পাশে কয়েকটি বাড়ির ওপর দিয়ে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছাতে হয়। গত শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, মা ও ভাই লিটন মিয়া অত্যন্ত কষ্ট করে হাবিয়া ও মেহেরজানকে কোলে করে ঘর থেকে বের করছেন। তাঁদের খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক কাজ সারতেও অন্যের সাহায্য নিতে হয়। তবে খর্বাকৃতি হওয়া সত্ত্বেও ইজ্জত ও সিরাজ কিছুটা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন। তাঁরা ভাটবাউর বাজারের সড়কের পাশে খোলা আকাশের নিচে পান-সিগারেটের দোকান চালান, যদিও সেখান থেকে আয় খুবই সামান্য। গত দুই বছর ধরে চার ভাই-বোন সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। এই ভাতা এবং জমির ফসলের সামান্য আয়েই তাঁদের সংসার চলে।

ইজ্জত আলীর দুই ছেলে ইয়াসির আরাফাত (২২) ও আলিফ আহম্মেদ (২০) উচ্চমাধ্যমিক পাস করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন। ইজ্জত আলী জানান, চরম অভাবের কারণে বড় ছেলে আরাফাত সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেছে। তিনি আশা করেন, ছেলের সরকারি চাকরি হলে তাঁদের সংসারের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে।

পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় তাঁরা চরম সংকটে আছেন। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী দুই বোনকে হাসপাতালে নিতে গেলে চরম ভোগান্তি পোহরাতে হয়। দুই বছর আগে প্রতিবেশীদের সহায়তায় কিছু মাটি ফেলা হলেও অর্থের অভাবে কাজ শেষ হয়নি। সরকারি উদ্যোগে রাস্তা নির্মিত হলে অন্তত হুইলচেয়ারের মাধ্যমে দুই বোনকে আনা-নেওয়া করা সম্ভব হতো।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজসেবক আমজাদ হোসেন বলেন, পরিবারটির চার সদস্য খর্বাকৃতির হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। রাস্তা না থাকায় তাঁরা আরও বিপাকে পড়েছেন। শুধু এই পরিবার নয়, আশপাশের আরও অন্তত ১০টি পরিবারের চলাচলের জন্য কোনো রাস্তা নেই, ফলে তাঁদের অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। তিনি জানান, তিনি এই বিষয়ে খোঁজখবর নেবেন এবং রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেবেন।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নেবেন তিনি। প্রতিবন্ধী ওই পরিবারসহ আশপাশের পরিবারগুলোর চলাচলে রাস্তা নির্মাণে উদ্যোগও নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, গত শনিবার মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার উদ্যোগে পরিবারটির মাঝে একটি সেলাই মেশিন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। মুক্তকণ্ঠের ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বন্ধুসভার সদস্যরা ওই বাড়িতে গিয়ে এসব উপহার তুলে দেন।