মায়ের কাছ থেকে পাওয়া মাত্র ২০ হাজার টাকার পুঁজি দিয়ে হাঁস পালন শুরু করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন মেহেরপুরের এক তরুণ উদ্যোক্তা। বাঁধন নামের ওই তরুণের খামারে এখন প্রায় এক হাজার হাঁস রয়েছে। শুধু হাঁস পালনই নয়, ইনকিউবেটর মেশিনের সাহায্যে হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করছেন তিনি। বাঁধনের দাবি অনুযায়ী, সব ধরনের আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে তার মাসিক মুনাফা প্রায় চার লাখ টাকা।

মেহেরপুর সদর উপজেলার রাধাকান্তপুর গ্রামের বাসিন্দা সেলিম ও দিলরুবা দম্পতির সন্তান বাঁধন। তিনি মেহেরপুর সরকারি কলেজের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। শৈশব থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তার। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি প্রথম বাড়ির ছাদে বাজরিগার পাখি পালন শুরু করেছিলেন। তবে করোনাভাইরাস মহামারির প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সেই উদ্যোগে তিনি সফল হতে পারেননি।

বাজরিগার পাখির ব্যর্থতার পর বাঁধন ব্রয়লার মুরগি পালনের ব্যবসায় যুক্ত হন। শুরুর দিকে ব্যবসাটি বেশ ভালো চললেও হঠাৎ বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে তিনি বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হন। পরপর দুটি ব্যবসায়িক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়েও দমে যাননি তিনি। নতুন করে কিছু করার তাড়না থেকে এবার তিনি হাঁস পালনের দিকে মনোনিবেশ করেন।

বাঁধন জানান, ইউটিউবে হাঁস পালন করে সফল হওয়া কয়েকজন উদ্যোক্তার জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প দেখে তিনি এই বিষয়ে আগ্রহী হন। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিয়ে তিন বছর আগে মায়ের দেওয়া ২০ হাজার টাকা পুঁজি করে ১০০টি ‘পিকিং স্টার-১৩’ জাতের হাঁসের বাচ্চা কেনেন। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় তার হাঁসের খামারের।

ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে সেখানে প্রায় এক হাজার হাঁস রয়েছে, যার অধিকাংশই ডিম দেওয়া শুরু করেছে। হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যে খামারের পাশেই স্থাপন করেছেন তিনি ইনকিউবেটর মেশিন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মেশিনটির ধারণক্ষমতা ৩৬ হাজার ডিম। বর্তমানে তিনি প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছেন।

বাঁধনের ভাষ্যমতে, প্রতি সপ্তাহে উৎপাদিত বাচ্চাগুলোর বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা। সব ধরনের পরিচালন ও উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় চার লাখ টাকা মুনাফা হচ্ছে তার। ব্যবসাকে আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন করে পাঁচ হাজার হাঁসের খামার তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

ছেলের এই সাফল্যে আনন্দিত মা দিলরুবা খাতুন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি ছেলের আগ্রহ ছিল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন থেকে সে প্রথমে বাজরিগার পাখি পালন শুরু করে। করোনার সময় সেখানে সফল হতে পারেনি। পরে মুরগি পালনের উদ্যোগেও লোকসান হয়। এরপর হাঁস পালনের জন্য ছেলেকে ২০ হাজার টাকা দেন তিনি।”

দিলরুবা খাতুন আরও বলেন, “সেই ২০ হাজার টাকা থেকে বর্তমানে ৩০ লাখ টাকায় ঠেকেছে।” তবে এই ৩০ লাখ টাকার পরিমাণটি খামারের মোট বিনিয়োগ, বর্তমান সম্পদ নাকি ব্যবসার বাজারমূল্য—তা তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি।

সন্তানদের কেবল চাকরির পেছনে ছোটাতে না বলে তাদের উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান দিলরুবা খাতুন।

এদিকে মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “মেহেরপুরে বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি পালন করা হয়। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে খামারিদের পশুপাখির পরিচর্যা, টিকা সরবরাহ ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। হাঁস পালনেরও ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। খামারিদের সহযোগিতা ও সমস্যা সমাধানে প্রাণিসম্পদ দপ্তর পাশে রয়েছে।”