সপ্তাহের ছুটির দিনে সাভার ও আশুলিয়ার বাজারগুলোতে মাংসের ব্যাপক ভিড় জমে। তবে প্রিয়জনের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত মাংস কিনতে গিয়ে ক্রেতারা চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। খাসির মাংসের কথা বলে ভেড়া এবং ষাঁড়ের বদলে অসুস্থ বুড়ো গাভী গছিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পচা-বাসি মাংসও বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলে তিন শতাধিক মাঝারি ও বড় বাজার থাকলেও পশু জবাইয়ের আগে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সিলমোহর দেওয়ার নিয়মটি কার্যত উপেক্ষিত। সরকারি ভেটেরিনারি সার্জনদের নিয়মিত পরিদর্শন না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীদের এই প্রতারণা এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ফলে হাজার হাজার রেস্তোরাঁ ও সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছে যাচ্ছে অনিরাপদ মাংস। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রোগাক্রান্ত পশুর মাংসের মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্সের মতো প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার স্পোর মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কসাইখানা না থাকায় খোলা জায়গায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশু জবাই ও মাংস কাটা হচ্ছে। পৌর এলাকায় একটি স্থান থাকলেও সেখানে কোনো চিকিৎসক নেই এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো অবকাঠামো নেই। সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে কবে পরীক্ষা হয়েছে, তা কেউ জানেন না। ফলে রাতের আঁধারে যাচাই-বাছাই ছাড়াই পশু জবাই চলছে। এই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে ফিকেল ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন প্যাথোজেনিক জীবাণু খাদ্য বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বলিবদ্র বাজারে আসা চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, "সপ্তাহের ছুটির দিনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু ভালো খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে মাংস কিনি। কিন্তু খাসি বললে ধরিয়ে দেয় ভেড়া। আর ভালো গরুর কথা বলে বুড়ো গাভী বা মরা গরুর মাংস দেয়। খোলা জায়গায় কাটাকাটি হয়, বোঝার কোনো উপায় থাকে না।"
সাভার নামাবাজারের গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, "মাংসের সাথে রক্ত মাখানো পচা-বাসি মাংস বা অতিরিক্ত চর্বি মিশিয়ে দেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বাজারে কসাইদের তদারকি করার কেউ নেই। যার যেভাবে খুশি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলে বলে আজকেই জবাই করা হয়েছে। আমরা বুঝব কিভাবে কোনটা ভালো বা খারাপ। বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে গরুর মাংস।"
আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার এক রেস্তোরাঁ মালিক হাসান জানান, নির্দিষ্ট কসাইখানা বা সরকারি সিল মারার ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কসাইদের দেওয়া মাংসই কেনেন। এতে তাদের প্রতিষ্ঠানের দুর্নামের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম জাহান জানান, ২০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি অর্গানোগ্রামে মাত্র একজন ভেটেরিনারি সার্জন রয়েছেন। এই বিশাল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন জবাই হওয়া পশু এককভাবে পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ। পৌরসভাতেও ভেটেরিনারি সার্জন পদ শূন্য। তিনি আধুনিক কসাইখানা স্থাপন, পানির ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের ওপর জোর দেন।
ঢাকা জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম জানান, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জবাইপূর্ব তদারকির প্রাথমিক দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ দপ্তরের। তবে প্রক্রিয়াজাত মাংস বাজারে এলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে যৌথ অভিযান চালিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, সাভার পৌরসভায় একটি কসাইখানা থাকলেও সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নেই এবং এটি ইজারা দেওয়া। কসাইখানা ইন্সপেক্টর পদটিও বর্তমানে শূন্য। তবে শূন্য পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোট ছোট ‘স্লটার হাউস’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এবং টাস্কফোর্সের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরম্যাটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আয়েশা আহমেদ বলেন, "আমাদের স্থানীয় খোলা বাজারগুলোতে যে কাঁচা মাংস আসছে তার কোনো স্বাস্থ্যগত নিশ্চয়তা নেই। সুস্থ পশু জবাই করা হচ্ছে কি না বা এর কোনো বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেশন হচ্ছে কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই। অ্যানথ্রাক্স একটি অত্যন্ত মারাত্মক স্পোর-ফর্মিং ব্যাকটেরিয়া। এই স্পোর সহজে ধ্বংস হয় না ও এগুলো দূর করতে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। কোনো খামারে অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলে পুরো খামার জীবাণুমুক্ত বা স্টেরিলাইজ করতে হয়। ফলে পরীক্ষা ছাড়া আসা মাংস স্পোর-মুক্ত কি না তা ভোক্তারা জানতে পারছেন না। তাই পরীক্ষা করাটা অত্যন্ত জরুরি।"