ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুব মহিলা লীগের নেত্রী এবং পেশায় স্কুলশিক্ষিকা ডালিয়া আক্তারকে (৪৫) হত্যার ঘটনায় তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশি তদন্তের দাবি অনুযায়ী, চুরির উদ্দেশ্যে ডালিয়া আক্তারের বাসায় প্রবেশ করে এবং তিনি তাঁদের চিনে ফেললে তাঁকে ছুরিকাঘাত ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। তবে পুলিশের এই ভাষ্যের সাথে একমত নন নিহত ডালিয়া আক্তারের ছোট মেয়ে লিজা আক্তার; তাঁর সন্দেহ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো প্রভাবশালী ‘মাস্টারমাইন্ড’ কাজ করছে।

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের মধ্যেপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. অনিক (১৯), চান্দেরচর এলাকার বাসিন্দা মো. আশিক (২৩) এবং চর গুলাগুলিয়া এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন (৩৬)।

আজ রোববার সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস/দক্ষিণ) তরিকুল ইসলাম গ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

তরিকুল ইসলাম জানান, গত শুক্রবার সকাল ছয়টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুরের রসুলপুর এলাকায় অবস্থিত সোনালী ব্যাংক ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে ডালিয়া আক্তারের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নিহত ব্যক্তির মেয়ে বাদী হয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, মামলার তদন্ত শুরু করে পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশের ক্লোজ সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে প্রথমে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানার বালুরচর এলাকা থেকে অনিককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে অনিকের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুর বাজার এলাকা থেকে আশিক ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তরিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে ডালিয়ার পূর্বপরিচয় ছিল। ডালিয়া সকালে গৃহকর্মীর কাজের জন্য বাসার দরজা খোলা রাখতেন এ বিষয়টি তাঁরা জানতেন। সেই সুযোগে পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে চুরির উদ্দেশ্যে তাঁরা ডালিয়ার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। ঘুমন্ত ডালিয়া তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়ে চিৎকার করলে তাঁকে ঝাপটে ধরেন তাঁরা। এ সময় ডালিয়া তাঁদের চিনে ফেলায় তাঁকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তার বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার পর আশিক ও আলমগীর ভবনের ছাদ দিয়ে অন্য ভবনে গিয়ে পালিয়ে যান। অন্যদিকে, অনিক বোরকা পরে বাসার মূল দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান। পালানোর সময় অনিক রসুলপুর এলাকার একটি বালুর মাঠে পরিহিত বোরকা ও জুতা ফেলে যান, যা পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার তিনজনকে ঢাকা জেলা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজগর আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) নিতাই চন্দ্র দাস এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) নওশেরসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

তবে পুলিশের দেওয়া এই কারণ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন নিহত ডালিয়া আক্তারের ছোট মেয়ে লিজা আক্তার। সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা মাকে চুরির উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়নি।’

চুরির উদ্দেশ্যে আসলে ঘরের আলমারি কেন ভাঙা হয়নি এবং ঘরের কোনো জিনিস কেন নেওয়া হয়নি—এমন যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে লিজা আক্তার দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ‘মাস্টারমাইন্ড’ রয়েছে। তিনি পুলিশের কাছে অনুরোধ জানান যেন অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে এই হত্যার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়।