নতুন বাস যুক্ত করা নিয়ে পরিবহন মালিকদের বিরোধের জেরে কিশোরগঞ্জ–মহাখালী রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। পূর্বঘোষণা ছাড়াই বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার দুই টার্মিনালে এসে বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা। বাধ্য হয়ে বিকল্প যানবাহনে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে তাদের। এ সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা থেকে এবং বিকেল ৫টার দিকে কিশোরগঞ্জ থেকে এ রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবহন মালিকদের একটি সূত্র জানায়, নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে পুরোনো বাসের পরিবর্তে নতুন বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে ঢাকার পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হলে তারাও সম্মতি দেন। পরে কিশোরগঞ্জের মালিকেরা পুরোনো বাস সরিয়ে নতুন বাস চালু করলেও ঢাকার মালিকেরা পুরোনো বাস পরিবর্তন করেননি। বরং এ রুটে আরও দুটি বাস যুক্ত করেন তারা।

কিশোরগঞ্জের গাইটাল আন্তজেলা বাস টার্মিনালের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজওয়ানুল আলম জোসেফ বলেন, ঢাকা থেকে অনন্যা পরিবহনের নতুন দুটি বাস যুক্ত করার বিষয়ে মালিকদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই বাস দুটি চালু করা হয়। নিয়ম না মেনে একতরফাভাবে বাস চালুর প্রতিবাদে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকবে।

এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। একপর্যায়ে ঢাকায় কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে অনন্যা পরিবহনের ৫০টি, অনন্যা ক্ল্যাসিকের ৫৭টি, জলসিঁড়ির ১০০টি এবং উজানভাটির ৩০টি বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার মহাখালী রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

বিকল্প যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

কিশোরগঞ্জের গাইটাল বাস টার্মিনালে দুই সন্তান ও ব্যাগপত্র নিয়ে মহাখালীগামী বাসের অপেক্ষায় ছিলেন পোশাকশ্রমিক রেহানা আক্তার। তিনি বলেন, ছোট সন্তান ও ভারী ব্যাগপত্র নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছেন। এ সুযোগে স্থানীয় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনাচালকেরা দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ ভাড়া দাবি করছেন।

রেহানা বলেন, ‘না পারছি ফিরতে, না পারছি বিকল্প উপায়ে যেতে। এখন তো যেতেই হবে। বাধ্য হয়ে ভেঙে ভেঙে যেতে হবে।’

জেলার তাড়াইল উপজেলা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে গাইটাল বাস টার্মিনালে এসেছিলেন তিতুমীর সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাহসানুল আরিফ। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছি। আগে থেকে জানা থাকলে আজ আসতাম না। এখন বাড়ি ফিরে গেলেও বাড়তি খরচ হবে। বাধ্য হয়েই ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা বাসে অথবা বাড়তি খরচ করে ঢাকায় যেতে হবে।’

তাহসানুল আরিফের অভিযোগ, কিছুদিন পরপর মালিক-শ্রমিকদের দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়াও গুনতে হয়।

জরুরি কাজে ঢাকায় যাচ্ছিলেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজারের ব্যবসায়ী আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্যবসায়িক কাজে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় যাওয়া প্রয়োজন ছিল। টার্মিনালে এসে দেখেন, কোনো বাস ছাড়ছে না। আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারতেন। পরিবহন মালিকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের মাশুল সবসময় সাধারণ যাত্রীদের দিতে হয়।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার জেলখানা মোড় ও বিন্নাটি বাস কাউন্টারেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। ঢাকাগামী বাস না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা যাত্রীরা।

হোসেনপুরের পুমদী এলাকা থেকে রাজধানীর বনানীতে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন তাহমিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কাউন্টারে লোকজন থাকলেও মহাখালীগামী বাসের টিকিট বিক্রি হচ্ছিল না। এসব দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষকে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা সরকার জানে না। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা কিছু হলেই বাস বন্ধ করে দেন। এসব বিষয়ে সরকারের কঠোর হওয়া উচিত।’

অনন্যা ক্ল্যাসিকের জেলখানা মোড় কাউন্টারের মাস্টার মো. কাজল খান বলেন, শনিবার দুপুরে টিকিট বিক্রির পর মহাখালী কাউন্টারে সমস্যার কথা জানতে পারেন তিনি। এরপর শনিবার বিকেল থেকে কিশোরগঞ্জ থেকে মহাখালীগামী বাসের টিকিট বিক্রি বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি না জেনে বিভিন্ন জায়গা থেকে যাত্রীরা এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন। মালিকদের সিদ্ধান্তের কারণে তারা টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, বাস চলাচল বন্ধের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। বিষয়টি জানার পরই পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। রোববার তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া বাস চলাচল বন্ধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।