বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সমৃদ্ধির স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। তৈরি পোশাক শিল্পের পর তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে একসময় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয়ের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বর্তমান বাস্তবতার সাথে সেই স্বপ্নের ব্যবধান এখনো অনেক বেশি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার। এই আয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশই এসেছে কম্পিউটার সেবা থেকে, যার মধ্যে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, আউটসোর্সিং এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সেবা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, ৫০০ কোটি ডলারের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তার বিপরীতে সরকারি হিসাবে অর্জিত সাফল্য মাত্র ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও রপ্তানির প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে; অনেকের মতে, ফ্রিল্যান্সিং এবং কিছু বিদেশমুখী আয়ের সম্পূর্ণ অংশ সরকারি হিসাবে নথিভুক্ত হয় না। তা সত্ত্বেও, লক্ষ্যমাত্রা এবং বাস্তবতার মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এই ব্যবধানকে কেবল ব্যর্থতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে একে একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এখন মূল প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশ কোন ধরনের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদান করতে পারে?
এর একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে—সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স ও টেস্টিং। আন্তর্জাতিক বাজারে কেবল কোড লিখলেই সাফল্য আসে না। বিদেশি গ্রাহকরা কেবল কম খরচে সফটওয়্যার তৈরির দেশ খোঁজেন না; বরং তাঁরা এমন অংশীদার চান যারা নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ, স্কেলেবল এবং ধারাবাহিকভাবে মানসম্পন্ন সফটওয়্যার সরবরাহ করতে সক্ষম। সফটওয়্যার দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হলেও সেটি সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, লাখো ব্যবহারকারীর চাপ সামলাতে পারবে কি না, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না কিংবা নতুন আপডেটের পর পুরোনো ফিচারগুলো অকেজো হয়ে যাবে কি না—এই বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে। মূলত বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আস্থা, আর এই আস্থার মূল ভিত্তি হলো মান বা কোয়ালিটি।
বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি নিয়ে আলোচনায় আমরা সাধারণত ডেভেলপার, ফ্রিল্যান্সার, আউটসোর্সিং বা বিজনেস প্রসেস সেবার কথা বলে থাকি। কিন্তু সফটওয়্যার কোয়ালিটিকে এখনো একটি স্বতন্ত্র রপ্তানি সক্ষমতা হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন সময় এসেছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের।
বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে ফাংশনাল টেস্টিং, টেস্ট অটোমেশন, পারফরম্যান্স টেস্টিং, সিকিউরিটি টেস্টিং, এপিআই টেস্টিং, মোবাইল টেস্টিং, ডেটা কোয়ালিটি, কনটিনিউয়াস টেস্টিং, এআই টেস্টিং এবং টেস্টিং-অ্যাজ-আ-সার্ভিস—সবই অত্যন্ত উচ্চমূল্যের পেশাগত সেবা। বাংলাদেশ কেবল বিদেশি গ্রাহকদের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করবে তা নয়, বরং আমাদের দক্ষ দলগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যারের কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স, টেস্ট অটোমেশন, পারফরম্যান্স, সিকিউরিটি এবং পূর্ণাঙ্গ কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারিং সেবা প্রদান করতে পারে।
এই ধরনের কাজের একটি বড় সুবিধা হলো, এগুলো রিমোটলি বা দেশ থেকেই করা সম্ভব। একজন দক্ষ টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা সিলেটে বসেই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সফটওয়্যার প্রজেক্টে কাজ করতে পারেন। এখানেই বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি আয় তৈরির প্রকৃত সুযোগ নিহিত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সফটওয়্যার তৈরির গতিকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এআই এখন কোড লিখছে, টেস্ট কেস তৈরি করছে, ত্রুটি শনাক্ত করছে এবং ডকুমেন্টেশন তৈরির মতো কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করছে। তবে এর ফলে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—সফটওয়্যার তৈরির গতি যত বাড়বে, তার মান যাচাইয়ের গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পাবে। এখন শুধু সফটওয়্যার টেস্ট করলেই হবে না, বরং এআই সিস্টেমগুলোকেও টেস্ট করতে হবে।
অনেকে মনে করেন এআই সফটওয়্যার টেস্টারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে, কিন্তু এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বরং এআই টেস্টারের কাজের ধরন বদলে দেবে এবং দক্ষতার মানকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে। ভবিষ্যতের কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারদের টেস্ট অটোমেশন, ডেটা, এআই, সিকিউরিটি, পারফরম্যান্স এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি সম্পর্কে আরও সমন্বিত ধারণা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ড বা বিএসটিবি-র যাত্রার মূল দর্শনই ছিল বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে নিতে হলে সফটওয়্যার মানের ওপর আলাদা গুরুত্ব দেওয়া। বিএসটিবি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং কোয়ালিফিকেশনস বোর্ডের বাংলাদেশে অনুমোদিত জাতীয় পর্ষদ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টেস্টিং সার্টিফিকেশন ইকোসিস্টেমের সঙ্গে দেশের পেশাজীবীদের সংযুক্ত করে আসছে। বর্তমানে ফাউন্ডেশন থেকে অ্যাডভান্সড ও স্পেশালিস্ট পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। তবে এখন বিএসটিবি-কে কেবল পরীক্ষা নেওয়া বা সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না; আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ আরও অনেক বড়।
বিএসটিবি-র লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১০ হাজার সার্টিফায়েড টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার তৈরিতে অবদান রাখা এবং তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে অ্যাডভান্সড ও স্পেশালিস্ট লেভেল সার্টিফিকেশন, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম ১০ হাজার কার্যকর ও কর্মক্ষম পেশাজীবী তৈরি করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
আগামী ৫ ডিসেম্বর ঢাকার শেরাটনে অনুষ্ঠিত হবে চতুর্থ এসকিউএটি বাংলাদেশ—সিম্পোজিয়াম অন সফটওয়্যার কিউএ অ্যান্ড টেস্টিং। এবারের প্রতিপাদ্য হলো—‘কোয়ালিটি ইন দ্য অ্যাজ অব এআই’। আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং কোয়ালিফিকেশনস বোর্ডের নিজস্ব কনফারেন্স নেটওয়ার্কেও ৫ ডিসেম্বরের এই আয়োজনটি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এবারের আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং কোয়ালিফিকেশনস বোর্ডের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া দুসা-জিগার এবং সাবেক গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট অলিভিয়ার ডেনো। তাঁদের পাশাপাশি এক প্ল্যাটফর্মে থাকবেন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কোয়ালিটি ডিরেক্টর, ব্যাংকের সিআইও ও সিটিও, টেলিযোগাযোগ খাতের এআই ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন প্রধান, সরকারের নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং সফটওয়্যার কোয়ালিটি পেশাজীবীরা।
এই সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের সফটওয়্যার কোয়ালিটি ইকোসিস্টেমকে বড় করতে হলে শিল্প, একাডেমিয়া এবং সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানি ঘাটতি পূরণ হবে না কিংবা ১০ হাজার দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হবে না। তবে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম সঠিক মানুষকে একই টেবিলে এনে একটি জাতীয় রোডম্যাপ তৈরির সূচনা করতে পারে। এসকিউএটি বাংলাদেশ থেকে কয়েকটি বাস্তব ফলাফল প্রত্যাশা করা হচ্ছে:
প্রথমত, সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারিংকে একটি স্বতন্ত্র পেশা ও রপ্তানি সেবা হিসেবে জাতীয়ভাবে আরও দৃশ্যমান করা।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ও ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনের মধ্যে ব্যবধান কমানো।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনকে সরকারি ও বেসরকারি দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা।
চতুর্থত, ফাউন্ডেশন সার্টিফিকেশনের পর পেশাজীবীদের অ্যাডভান্সড ও স্পেশালিস্ট লেভেলে নিয়ে যাওয়া।
পঞ্চমত, সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ফিনটেক, টেলিযোগাযোগ ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরি করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশের সফটওয়্যার টেস্টিং সক্ষমতাকে বৈশ্বিক প্রকল্প ও রপ্তানি বাজারে যুক্ত করা।
৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের স্বপ্নটি ভুল ছিল না, তবে ঘাটতি ছিল সেই স্বপ্নে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় গভীর ও পরিমাপযোগ্য ভ্যালু চেইন তৈরির। তাই এখন আর শুধু বড় রপ্তানি সংখ্যা ঘোষণা করলেই হবে না; বরং নির্দিষ্ট করতে হবে কোন সার্ভিস থেকে আয় আসবে, কোন দক্ষতা প্রয়োজন, কতজন পেশাজীবী লাগবে, তাঁদের আন্তর্জাতিক মান কীভাবে নিশ্চিত হবে, কোন ইন্ডাস্ট্রি চাকরি দেবে, কোন বৈশ্বিক বাজার সেবা কিনবে এবং সেই আয় কীভাবে দেশে আসবে।
সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স এই প্রশ্নগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের উত্তর দিতে পারে। বাংলাদেশ যদি ১০ হাজার আন্তর্জাতিকভাবে সার্টিফায়েড টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে তাঁদের অ্যাডভান্সড স্কিলস প্রদান করতে পারে এবং দেশি ও বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে এর প্রভাব কেবল ১০ হাজার চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁরা দেশের সফটওয়্যার কোম্পানির মান বাড়াবেন এবং ব্যাংকিং, ফিনটেক, টেলিকম ও সরকারি ডিজিটাল সিস্টেমকে আরও নির্ভরযোগ্য করবেন। পাশাপাশি বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স ও টেস্টিং সার্ভিস এক্সপোর্ট করবেন।
আর সেই লক্ষ্যেই বিএসটিবি ও এসকিউএটি বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে চায়—যেখানে দক্ষতা থেকে সার্টিফিকেশন, সার্টিফিকেশন থেকে কর্মসংস্থান এবং কর্মসংস্থান থেকে রপ্তানি আয়—পুরো পথটি দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য হবে।
— ড. এম. নুরুজ্জামান: সভাপতি, সোসাইটি ফর বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ড