কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহারের ফলে সফটওয়্যারের এমন সব নিরাপত্তাত্রুটি এখন শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, যা দীর্ঘ বছর ধরে অজানাই ছিল। একদিকে যেমন সফটওয়্যারের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করা সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তেমনি সাইবার অপরাধীদের জন্য এই দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে হামলা চালানোর সুযোগ দ্রুত তৈরি হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ ধরনের ত্রুটির কারণে বিশ্বজুড়ে একের পর এক বড় ধরনের নিরাপত্তা-সংকট দেখা দিতে পারে।
সম্প্রতি প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে নতুন কিছু নিরাপত্তাত্রুটি ধরা পড়ার পর ইউরোপ ও এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সরকারি সংস্থা এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের একাধিক ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণ রুখতে এই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, এটি আরও বড় কোনো নিরাপত্তা-সংকটেরই শুরু হতে পারে।
ইন্টারনেট অবকাঠামো এবং ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ম্যাথিউ প্রিন্স জানিয়েছেন, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারের গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি তাদের নজরে এসেছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এআই-এর সহায়তায় ইন্টারনেটের মৌলিক অবকাঠামোতে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের কোডগুলো অত্যন্ত দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘকাল ধরে গোপন থাকা দুর্বলতাগুলো একের পর এক সামনে চলে আসছে। এই পরিস্থিতি সাইবার নিরাপত্তা খাতকে আগামী কয়েক বছর প্রচণ্ড চাপের মুখে ফেলতে পারে। ম্যাথিউ প্রিন্স বলেন, ‘আমার মনে হয়, আগামী কয়েক বছর এমন যাবে যে প্রতি সপ্তাহেই মনে হবে, সবকিছু ভেঙে পড়তে যাচ্ছে।’
পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটি নিয়ে সাম্প্রতিক এই তৎপরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই সময়ে প্রযুক্তি খাতের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তাত্রুটি এবং অননুমোদিত অনুপ্রবেশের ঘটনা সামনে এসেছে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ভালনচেকের গবেষক প্যাট্রিক গ্যারিটির মতে, এই ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ নিরাপত্তা-সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে পিএইচপির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় নোড ডট জেএস এবং স্ট্রিমিং মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম প্লেক্সের গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া এআই সেবা পরিচালনায় ব্যবহৃত লাইটএলএলএম এবং অ্যাপ্লিকেশন হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম রেলওয়েতেও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে এসেছে।
সাধারণত আধুনিক সফটওয়্যারগুলো বিপুল পরিমাণ কোডের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়। এই বিশাল কোডবেসের মধ্যে থাকা ছোটখাটো ত্রুটিগুলো অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়। কিছু দুর্বলতা বছরের পর বছর সফটওয়্যারের ভেতরেই থেকে যায়, যার কথা নির্মাতারাও জানতে পারেন না। আগে এই ধরনের জটিল নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করতে বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ সময় ধরে কোড বিশ্লেষণ করতে হতো। পাশাপাশি, কোনো দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সফটওয়্যারে অনুপ্রবেশের কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করতে দক্ষ গবেষকদের কয়েক সপ্তাহ বা এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগত। এই সময়ের ব্যবধানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ত্রুটি সংশোধন, সমাধানের পরীক্ষা এবং ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপত্তা হালনাগাদ পৌঁছে দেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পেত।
তবে এআই-এর অভাবনীয় অগ্রগতিতে সেই পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম এআই মডেলগুলো এখন মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ লাইনের কোড পরীক্ষা করে একাধিক নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করতে পারছে। শুধু শনাক্ত করাই নয়, এই দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণ করার উপযোগী কোডও তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তৈরি করে ফেলতে পারে। ফলে নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়া এবং তা সংশোধনের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান এখন আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। কোনো ত্রুটি ধরা পড়ার পর তা সংশোধনের আগেই সাইবার অপরাধীরা তা কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এতে সফটওয়্যার নির্মাতা এবং সাইবার নিরাপত্তা দলগুলোর ওপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে।