নবযুগের অগ্রদূত হিসেবে বারবার সামনে এগিয়ে এসেছে তরুণ প্রজন্ম। আজ থেকে ২০ বছর আগে উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে যে প্রতিবাদের আওয়াজ প্রথম উঠেছিল, তা বর্তমানে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মরক্কো, তিউনিসিয়া এবং মিসরের তরুণেরা সর্বপ্রথম রাজপথে নেমেছিল। তাদের দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত মৌলিক—কাজ, শিক্ষা এবং মর্যাদা। এই সাহসী কণ্ঠস্বরই এক অগ্নিবীজে পরিণত হয়, যা পরবর্তীতে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ডিজিটাল যুগের সন্তান জেনারেশন জেড-এর হৃদয়ে এখন জ্বলছে বিদ্রোহের তীব্র অগ্নিশিখা।
২০২৪ সালে ঢাকার রাজপথে যে তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল এক অনন্য অগ্নিবীজ। দুর্নীতি, বৈষম্য এবং বেকারত্বের মতো দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিরুদ্ধে তরুণেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, পোশাক শ্রমিক এবং এমনকি স্কুলপড়ুয়া কিশোররাও এই মিছিলের স্রোতে মিশে গিয়েছিল। এই গণআন্দোলন কেবল সরকারের পতনই ঘটিয়নি, বরং বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে যে জেনারেশন জেড কেবল ভোগবাদী নয়, তারা প্রয়োজনে লড়াই করতে জানে এবং প্রাণ দিতে পারে। এটি ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা, যেখানে সরকারের পতন হওয়ার পর তারা সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের পাতায় এমন উদাহরণ অত্যন্ত বিরল।
২০২৫ সালে নেপালের সরকার যখন ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে, তখন তরুণদের রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো মাধ্যমগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা যায়নি। ফলস্বরূপ কাঠমান্ডুর সংসদ ভবন আগুনে engulfed হয় এবং প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এটি যেন এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।
ইন্দোনেশিয়ায় যখন সংসদ সদস্যরা নিজেদের জন্য ন্যূনতম মজুরির ১০ গুণ বিলাসবহুল বাসস্থান ভাতা ঘোষণা করল, তখন ছাত্ররা রাজপথে নেমে এল। তাদের হাতে ছিল ‘ওয়ান পিস’ কার্টুনের পাইরেট পতাকা। এই প্রতীকের মাধ্যমে তরুণেরা নিজেদের জলদস্যু হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতার যোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করল।
বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও যখন শাসকেরা বিলাসে মত্ত থাকে, তখন ২০২৫ সালে মাদাগাস্কারের তরুণেরা রাস্তায় নেমে দাবি জানাল, ‘আমাদের অন্ধকারে তোমাদের প্রাসাদ জ্বলবে না।’ শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে হয়। এটি যেন আফ্রিকার মাটিতে সেই চিরন্তন বাণীর প্রতিধ্বনি, ‘অন্ধকারে আলো জ্বালো’।
তবে একটি বাস্তব সত্য হলো, যে শক্তি পরিবর্তনের আগুন জ্বালায়, সেই শক্তি যদি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে আন্দোলনের আবেগ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। ইতিহাসে অনেক যুববিদ্রোহ ঝড় তুলেছে, কিন্তু সবাই নতুন সমাজ নির্মাণে সফল হয়নি।
মরক্কোর তরুণেরা বেকারত্বে ক্লান্ত এবং বৈষম্যে ক্ষুব্ধ। তাদের মিছিল মরুভূমির বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা বলেছিল, ‘আমরা মরুভূমির সন্তান, কিন্তু মরীচিকা চাই না, চাই বাস্তব।’
অন্যদিকে ভারতে আইন করে কোটি কোটি নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দিল্লিতে সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন যে তরঙ্গ উঠেছে, তা মূলত জেন-জি প্রজন্মের বিদ্রোহ। অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষাব্যবস্থার ভেঙে পড়া এবং বাসস্থানের অযোগ্যতা তাদের রাজপথে নামিয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, স্লোভাকিয়া থেকে আলবেনিয়া পর্যন্ত তরুণদের এই আন্দোলন এক নতুন সামাজিক মহাকাব্যে রূপ নিচ্ছে।
ইউরোপ এখন আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ে ভাসছে। অনেক দেশে ঋণ ও বাজেট-ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফ্রান্সে স্কুলে শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ছাদ এবং দীর্ঘ সময়ের ক্লাসের কারণে তরুণদের ক্ষোভের সূত্রপাত হয়। স্পেনে গত এক দশকে বাড়িভাড়া ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তরুণদের জন্য স্বাধীন জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলবেনিয়ায় একটি পরিবেশগত দ্বীপে রিসোর্ট নির্মাণের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে দুর্নীতি ও শাসকের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়।
ফ্রান্সের ছাত্ররা দাবি জানাচ্ছে, ‘পড়াশোনার জন্য টাকা দাও, দমননীতি নয়।’ তাদের এই মিছিল প্যারিস থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দে সল চত্বরে তরুণেরা বলছে, ‘আমাদের ঘর নিয়ে খেলো না।’ ভাড়া বৃদ্ধি ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাদের এই লড়াই এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। গ্রিস ও স্লোভাকিয়ায় রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাব ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকটে তরুণেরা রাস্তায় নেমেছে। আলবেনিয়ায় পরিবেশ রক্ষার দাবি এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক বৃহৎ তরঙ্গে পরিণত হয়েছে। বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়ায় শিক্ষার বাজেট কমানোর প্রতিবাদে ছাত্ররা বিক্ষোভ করছে।
দিল্লির তরুণদের ক্ষোভের মূলে রয়েছে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার সংকট। তারা মনে করে, ভোটার তালিকায় যদি মানুষের নাম অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে। তাই তাদের কণ্ঠে আজ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্য নির্বাচনের দাবি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
এই বৈশ্বিক আন্দোলনের মধ্যে এক অদ্ভুত সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। টিকটকের মাধ্যমে স্লোগান সেকেন্ডের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। ইনস্টাগ্রামের ছবিতে দুর্নীতিবাজদের বিলাসী জীবন উন্মোচিত হচ্ছে। ডিসকর্ড ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে হচ্ছে আন্দোলনের গোপন সমন্বয়। মিম ও পপ কালচার এই বিদ্রোহকে করেছে রঙিন ও প্রাণবন্ত।
যখন তরুণদের কণ্ঠস্বর আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন ক্ষমতাসীনদের মনে জন্ম নেয় ভয়। এই ভয় থেকেই তারা দমনের মুখোশ হিসেবে বিভিন্ন যুক্তি তৈরি করে। শাসকগোষ্ঠী কখনো আইনশৃঙ্খলার দোহাই দেয়, কখনো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা বলে, আবার কখনো উন্নয়নের দোহাই দিয়ে তরুণদের আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শাসকেরা দাবি করে, তরুণদের আন্দোলন রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করছে এবং এটি বিদেশি ষড়যন্ত্র বা বহিরাগত শক্তির প্ররোচনা। অথচ তরুণদের এই কণ্ঠস্বর আসলে তাদের নিজস্ব ক্ষুধা, বেকারত্ব ও বৈষম্যেরই প্রতিধ্বনি। শাসকেরা মিছিলকে বিশৃঙ্খলা এবং প্রতিবাদকে ভাঙচুর হিসেবে অভিহিত করে পুলিশি দমনকে বৈধতা দেয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, যেখানে অন্যায় থাকে, সেখানে প্রতিবাদই হয়ে ওঠে ন্যায়।
রক্ষণশীলরা মনে করেন, তরুণেরা অপরিণত এবং অভিজ্ঞতাহীন, তারা রাষ্ট্র পরিচালনার জটিলতা বোঝে না। অথচ ইতিহাসে দেখা গেছে, অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে অনেক সময় অন্যায়কে টিকিয়ে রাখা হয়েছে, আর প্রকৃত পরিবর্তন এসেছে তরুণদের হাত ধরেই।
ইউরোপের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে যে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। সমাজবিজ্ঞানীরা একে গভীর সামাজিক অসন্তোষের লক্ষণ হিসেবে বিশ্লেষণ করেন।
যখন সমাজের একটি অংশ মনে করে যে তাদের কণ্ঠস্বর ক্ষমতার প্রাসাদে পৌঁছাচ্ছে না, তখন প্রতিবাদের ভাষা যুক্তির মঞ্চ ছেড়ে ক্রোধের আগুনে রূপ নেয়। পোড়া গাড়ি বা ভাঙা জানালা কেবল বস্তুগত ক্ষতি নয়, বরং তা বিচ্ছিন্নতা, বঞ্চনা ও ক্ষোভের অস্থির প্রতীক।
তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিবাদ এবং লুটপাট বা অগ্নিসংযোগ এক নয়। একটি আন্দোলনের ভেতরে যেমন অনেক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী থাকেন, তেমনি কিছু গোষ্ঠী সহিংসতার পথ বেছে নেয়। সহিংসতা কখনোই আন্দোলনের সব অংশগ্রহণকারীর উদ্দেশ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে না।
বর্তমান প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, তরুণদের আন্দোলন তিনটি প্রধান পথে এগোতে পারে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবিতে—যেখানে নির্বাচন, স্বচ্ছতা, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন প্রধান। তারা রাষ্ট্রকে কেবল শক্তিশালী নয়, বরং জবাবদিহিমূলক দেখতে চায়।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দিকে—বেকারত্ব, অনিশ্চিত চাকরি এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্য তরুণদের প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের আন্দোলনগুলো জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে—প্রচলিত দলীয় কাঠামোর প্রতি আস্থা হারিয়ে অনেক তরুণ এখন বিকল্প নেতৃত্ব, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং বিকেন্দ্রীভূত সংগঠনের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে আন্দোলনের ভাষা ও পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে।
তবে একটি সতর্কবার্তা রয়ে গেছে। যে শক্তি পরিবর্তনের আগুন জ্বালায়, সেই শক্তি যদি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে আন্দোলনের আবেগ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। ইতিহাসে অনেক যুববিদ্রোহ ঝড় তুলেছে, কিন্তু সবাই নতুন সমাজ তৈরি করতে পারেনি।
— মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক। (মতামত লেখকের নিজস্ব)