জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে বিএনপি সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তার দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে এবং বর্তমানে বিদ্যমান একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটিকে বিলুপ্ত করতে হবে। এই দাবিগুলো মানা না হলে বিরোধী দলগুলোর বর্তমান আন্দোলন অদূর ভবিষ্যতে একটি বিশাল গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) জুলাই সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আখতার হোসেন। উক্ত সম্মেলনে এনসিপির অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে আখতার হোসেন বলেন, “জুলাই সনদে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।” তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও জোটের অংশগ্রহণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়। এরপর এই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি আরও বলেন, “গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত দিয়েছেন।” ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরির পরিবর্তে জনগণের রায় কার্যকর করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। তবে তার অভিযোগ, বিএনপি সরকার গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি একদলীয় কমিটি গঠন করেছে।
আখতার হোসেনের মতে, গণভোটের প্রশ্নগুলোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সংসদের উচ্চকক্ষ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য পৃথক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানো সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি দাবি করেন, এসব প্রস্তাবের কোনটি দেশের বা জনগণের জন্য ক্ষতিকর, তা সরকার স্পষ্ট করে বলতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, “জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।” তাই সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও গণভোটের রায় উপেক্ষা করার অধিকার সরকারের নেই। জনগণের রায় যেখানে নেই, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে বিএনপির অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, সরকার বারবার সনদটি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বললেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না।
সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ শর্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজস্ব ব্যবস্থা নিতে পারবে”- এমন একটি নোট সনদে যুক্ত করা হয়েছিল।
আখতার হোসেনের দাবি, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে ১৭ তারিখে পাঠানো চূড়ান্ত খসড়ায় ওই নোটটি ছিল না। সনদ স্বাক্ষরের দিন সরকারদলীয় একজন ব্যক্তি এটি যুক্ত করেন। তার অভিযোগ, ভবিষ্যতে সংস্কার বাস্তবায়ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখতেই এই শর্তটি যুক্ত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিএনপি গণভোটের রায়কে কখনো অসাংবিধানিক, আবার কখনো অকার্যকর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অথচ গণভোটের আগে দলটির নেতারা এর পক্ষে কথা বলেছিলেন। এমনকি নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির অবস্থানকে স্ববিরোধী আখ্যা দিয়ে আখতার হোসেন বলেন, দলটির ৩১ দফায় সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে গেছে। একইভাবে জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে বিএনপির কোনো ভিন্নমত বা আপত্তি ছিল না, সেগুলোরও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলের সংসদীয় আসনগুলোতে উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের গুরুতর অভিযোগও তোলেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সরকারি দলের আসনগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের আসনগুলোকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
তার দাবি অনুযায়ী, সরকারি দলের আসনগুলোতে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য প্রায় আট হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যেখানে বিরোধী দলের আসনগুলোকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া টিআর, কাবিখা ও দুর্যোগ মোকাবিলার বরাদ্দেও বৈষম্য করা হচ্ছে। সরকারি দলের আসনে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের আসনে শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে।
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি দলের ২০৩টি আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান এনসিপির সদস্য সচিব। তিনি আরও বলেন, বিএনপির প্রার্থী কোনো ইউনিয়নে জয়ী না হলে সেখানে উন্নয়নকাজ করা হবে না—এমন বক্তব্যও দেওয়া হয়েছে। আখতার হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু জনগণের সঙ্গে বিরোধের কারণে তাদের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
সারের ডিলার নিয়োগেও দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেন আখতার হোসেন। তার দাবি, বিএনপি নেতাদের ভাই, স্ত্রী, ভগ্নিপতি ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি কিছু আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পেয়েছেন। যাঁরা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেননি, তাঁদেরও দলীয় পরিচয়ের কারণে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আখতার হোসেন বলেন, সারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমন ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হলে চলমান সারসংকট আরও বাড়তে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার পরিবর্তে সরকার দলীয়করণকে প্রাধান্য দিচ্ছে। সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলীয় প্রভাবের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রধান হিসেবে দলীয় অনুগত কাউকে নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে চায় না বলে তিনি দাবি করেন।
আখতার হোসেন বলেন, অতীতেও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার কারণে দেশে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এবারও একই পথে এগোলে তার পরিণতি শুধু বিএনপিকে নয়, পুরো দেশকে ভোগ করতে হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজারের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন আখতার হোসেন। তার দাবি, রিসোর্টটিতে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিয়ে আগে থেকেই সমস্যা ছিল এবং কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে এনসিপির সদস্য সচিব সরকারের প্রতি দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। এসব দাবি বাস্তবায়ন না হলে চলমান বিরোধী দলের আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেন আখতার হোসেন।