বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কেউ হয়তো নিয়মিত খোঁজখবর নিতে পছন্দ করেন, আবার কেউ দিনের পর দিন কথা না বলেও বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই পার্থক্য দেখা যায়। কেউ বন্ধুর মেসেজের উত্তর পেতে দেরি হলে চিন্তিত হয়ে পড়েন, কেউ আবার মেসেজ দেখেও নিজের সুবিধামতো উত্তর দেন। এমন আচরণের পেছনে ব্যক্তির সম্পর্ক গড়ে তোলার ধরন বা অ্যাটাচমেন্ট স্টাইলের ভূমিকা থাকতে পারে বলে জানাচ্ছে অনেক গবেষণা।
মনোবিজ্ঞানে অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল বলতে সাধারণত অন্য মানুষের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক গড়ে তোলা, ঘনিষ্ঠতা অনুভব করা এবং সম্পর্কের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর ধরনকে বোঝায়। এই ধারণা বুঝতে সাহায্য করতে পারে, কেন কেউ অনলাইনে বন্ধুত্ব ধরে রাখতে বেশি উদ্যোগী হন, আর কেউ ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখতে পছন্দ করেন। তবে মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও একটি আচরণ দেখেই তার অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল কী?
মানুষ ছোটবেলা থেকে পরিবার ও কাছের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ঘনিষ্ঠতা, বিশ্বাস এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে এসব অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে বুঝতে হবে, অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল সবার ক্ষেত্রে একই রকম থাকে না। সময়, অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট সম্পর্কের পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের আচরণেও সাভাবিক পরিবর্তন আসতে পারে।
সাধারণভাবে অ্যাটাচমেন্ট স্টাইলকে নিরাপদ, উদ্বিগ্ন, এড়িয়ে চলার প্রবণতাযুক্ত এবং উদ্বিগ্ন ও এড়িয়ে চলার মিশ্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ধরনে ব্যাখ্যা করা হয়। এগুলো কোনো রোগের নাম না। বরং সম্পর্কের আচরণ বোঝার একটি মনোবৈজ্ঞানিক কাঠামো মাত্র।
বন্ধুত্বে চার ধরনের অ্যাটাচমেন্ট স্টাইলের প্রকাশ
নিরাপদ অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল
যাদের নিরাপদ অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল আছে, তারা সাধারণত বন্ধুত্বে বিশ্বাস ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দেন। বন্ধু মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করলে তারা সব সময় নেতিবাচক কিছু ভাবেন না। তারা বুঝতে পারেন, কাজের ব্যস্ততা বা ব্যক্তিগত কারণে সব সময় অনলাইনে থাকা সম্ভব না।
এ ধরনের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে একে অপরকে ব্যক্তিগত সময়ও দিতে পারেন। তাদের কাছে বন্ধুত্বের গভীরতা শুধু মেসেজের সংখ্যা বা পোস্টে লাইক দেওয়ার ওপর নির্ভর করে না।
উদ্বিগ্ন অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল
উদ্বিগ্ন অ্যাটাচমেন্ট স্টাইলের মানুষেরা অনেক সময় সম্পর্ক হারানোর ভয় বা অন্যের কাছে নিজের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ভোগেন। বন্ধুর মেসেজের উত্তর পেতে দেরি হলে তারা ভাবতে পারেন, বন্ধু হয়তো তাদের এড়িয়ে চলছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রবণতার কিছু প্রকাশ হতে পারে-
বন্ধু অনলাইনে আছেন কি না, তা বারবার দেখা।
মেসেজ দেখেও উত্তর না দিলে মন খারাপ করা।
নিজের পোস্টে বন্ধু লাইক বা মন্তব্য না করলে অবহেলিত বোধ করা।
বন্ধুত্ব ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে বারবার আশ্বাস চাওয়া।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় ১১ হাজার ৭০০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে উদ্বিগ্ন অ্যাটাচমেন্টের সঙ্গে সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই না যে উদ্বিগ্ন অ্যাটাচমেন্ট আছে এমন সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটান।
এড়িয়ে চলার প্রবণতাযুক্ত অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল
এ ধরনের মানুষেরা সাধারণত নিজের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পরিসরকে বেশি গুরুত্ব দেন। তারা বন্ধুত্ব পছন্দ করলেও সব সময় আবেগের কথা বলতে বা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে স্বচ্ছন্দ বোধ নাও করতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের আচরণ এমন হতে পারে-
বন্ধুদের পোস্ট দেখলেও খুব বেশি মন্তব্য না করা।
নিয়মিত চ্যাটের বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলা।
ব্যক্তিগত বিষয় অনলাইনে শেয়ার করতে অনাগ্রহী থাকা।
অতিরিক্ত ঘন ঘন মেসেজ বা মনোযোগের প্রত্যাশায় অস্বস্তি বোধ করা।
তবে কম পোস্ট করা বা দেরিতে উত্তর দেওয়াই এড়িয়ে চলার অ্যাটাচমেন্ট স্টাইলের প্রমাণ নয়। কেউ স্বভাবগতভাবে অন্তর্মুখী হতে পারেন, ব্যস্ত থাকতে পারেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কম ব্যবহার করতে পারেন।
উদ্বিগ্ন ও এড়িয়ে চলার মিশ্র প্রবণতা
কিছু মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভয় কাজ করতে পারে। তারা বন্ধুত্ব তো চান, কিন্তু খুব বেশি আবেগগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও অনুভব করেন।
অনলাইনে তারা কখনো বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে চাইতে পারেন, আবার কখনো হঠাৎ যোগাযোগ কমিয়ে দিতে পারেন। সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তা সরাসরি প্রকাশ করতে অসুবিধা হতে পারে।
তবে মানুষের অ্যাটাচমেন্টের ধরন সব সময় নির্দিষ্ট চারটি ভাগের একটিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তিভেদে এসব বৈশিষ্ট্যের মাত্রা আলাদা হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি বন্ধুত্বের ওপর প্রভাব ফেলে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দূরে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সহজ করে। ছবি, বার্তা, মন্তব্য অথবা ভিডিও কলের মাধ্যমে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়। কিন্তু অনলাইন যোগাযোগ কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝি ও অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগও তৈরি করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, বন্ধু অনলাইনে থেকেও মেসেজের উত্তর না দিলে কেউ ভাবতে পারেন তাকে ইচ্ছা করে এড়িয়ে চলা হচ্ছে। আবার অন্য কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন। একই ঘটনা নিয়ে এই ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার পেছনে ব্যক্তির প্রত্যাশা, অতীত অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের নিরাপত্তাবোধ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২১ সালে প্রকাশিত ১৭টি গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মানুষের অ্যাটাচমেন্ট স্টাইলের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরন ও উদ্দেশ্যের সম্পর্ক থাকতে পারে। উদ্বিগ্ন প্রবণতার মানুষেরা অনলাইনে অন্যের কাছ থেকে আশ্বাস খুঁজতে পারেন, আর এড়িয়ে চলার প্রবণতার মানুষেরা সরাসরি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছাড়াই অন্যদের খোঁজখবর রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন।
অনলাইনে বন্ধুত্ব ভালো রাখতে কী করবেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কয়েকটি অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
দেরিতে উত্তর দেওয়াকে সব সময় অবহেলা ভাববেন না। বন্ধু ব্যস্ত থাকতে পারেন বা ব্যক্তিগত সময় কাটাতে পারেন। একটি ঘটনা থেকে সম্পর্কের অবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক না।
নিজের প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে জানান। নিয়মিত কথা বলা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলে বন্ধুর সঙ্গে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। একই সঙ্গে তাঁর প্রয়োজন ও ব্যক্তিগত পরিসরকেও গুরুত্ব দিন।
অনলাইনের প্রতিক্রিয়াকে বন্ধুত্বের একমাত্র মাপকাঠি করবেন না। লাইক, মন্তব্য কিংবা মেসেজের উত্তর দেওয়ার গতি দিয়ে একটি সম্পর্কের সম্পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায় না।
নিজের অনুভূতি খেয়াল করুন। বন্ধু অনলাইনে কী করছেন, তা বারবার পরীক্ষা করার কারণে যদি উদ্বেগ বাড়ে, তাহলে কিছু সময়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিরতি নিতে পারেন।
প্রয়োজন হলে সরাসরি কথা বলুন। কোনো আচরণে কষ্ট পেলে অনুমান করার বদলে বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্বের ধরন আমাদের সম্পর্কের প্রত্যাশা, নিরাপত্তাবোধ এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতে পারে। তবে কারও অনলাইন আচরণ দেখেই তার ব্যক্তিত্ব বা অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না।
মনে রাখবেন, বন্ধুত্ব টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন কথা বলা বা প্রতিটি পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানানো জরুরি না বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া, সম্মান এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকার মানসিকতাই একটি সুস্থ বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তথ্যসূত্র
CNN Health: Social media, attachment style and friendships
Journal of Social and Personal Relationships: A systematic review of associations between the use of social network sites and attachment style
PubMed: Adult attachment, social anxiety and problematic social media use
Heliyon: Attachment style moderates the relationship between social media use and user mental health and wellbeing