মুসলিম জাহানের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানপীঠ ছিল বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসা। আর এই বিদ্যাপীঠের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালি, যিনি মাত্র ৩৪ বছর বয়সে প্রধান অধ্যাপকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
অসামান্য পাণ্ডিত্য, রাজকীয় প্রভাব, শত শত মেধাবী শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধা এবং রাজদরবারের উচ্চ সম্মান—সবই ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়। তবে সাফল্যের এই চরম শিখরে পৌঁছেই তিনি এক গভীর অস্তিত্বসংকটে আক্রান্ত হন। তিনি উপলব্ধি করলেন, তাঁর পাঠদান এবং বাগ্মিতার পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে ব্যক্তিগত খ্যাতি ও অহংবোধের মোহ বেশি কাজ করছে। ফলে ৪৮৮ হিজরিতে সবকিছু তুচ্ছ করে নিঃশব্দে বাগদাদ ত্যাগ করেন তিনি।
এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ আত্মশুদ্ধির পথচলা। দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের নির্জন মিনার, জেরুজালেমের পবিত্র প্রাঙ্গণ এবং মক্কার মরুপ্রান্তরে প্রায় এক দশক নিজেকে লুকিয়ে রেখে কৃচ্ছ্রসাধন ও আত্মমগ্নতায় অতিবাহিত করেন তিনি। কিন্তু যে মানুষটি পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ছেড়ে নির্জনবাসকে ঠিকানা বানিয়েছিলেন, ১১ বছর পর ৪৯৯ হিজরিতে তিনি কেন পুনরায় শিক্ষকতার আঙিনায়, নিশাপুরের পরিপূর্ণ ক্লাসরুমে ফিরে এলেন?
দীর্ঘ নির্জন সাধনার পর গাজালির সামনে আত্মিক জগতের এক পরম সত্য উন্মোচিত হয়। তিনি অনুভব করেন, মানুষের প্রকৃত পরিচয় রক্ত-মাংসের দেহে নয়, বরং তার অন্তরে। তাঁর এই বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তনের আত্মজৈবনিক কারণ বর্ণিত হয়েছে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল’ (বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি)-এর পাতায়। গাজালির স্বীকারোক্তি থেকে স্পষ্ট হয় যে, এই প্রত্যাবর্তন কোনো জাগতিক পদমর্যাদার লোভে ছিল না, বরং তা ছিল একজন আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের সামাজিক দায়বদ্ধতার তীব্র তাগিদ।
নির্জনবাসে দীর্ঘ সাধনার পর গাজালির সামনে আত্মিক জগতের এক পরম সত্য উন্মোচিত হয়েছিল। তিনি অনুভব করলেন, মানুষের আসল পরিচয় তার রক্ত-মাংসের দেহে নয়, বরং তার অন্তরে। তিনি লিখছেন:
“মানুষ মূলত দেহ ও অন্তরের সমন্বয়ে সৃষ্টি। আর “অন্তর” বলতে আমি মানুষের আত্মার সেই মৌলিক সত্যকে বোঝাচ্ছি, যা খোদা-পরিচিতির (মারিফাতুল্লাহ) কেন্দ্রস্থল; রক্ত-মাংসের সেই পিণ্ডটি নয়, যার অস্তিত্বে মৃতদেহ কিংবা চতুষ্পদ জন্তুরও অংশীদারত্ব রয়েছে। দেহের যেমন একটি সুস্থ অবস্থা রয়েছে, যা তাকে সুখ ও শক্তি দেয়, আর অসুস্থতা তাকে ঠেলে দেয় ধ্বংসের মুখে; অন্তরের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই।” (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১০)
এই অন্তরের ব্যাধি দূর করার ব্যবস্থাপত্র কোনো সাধারণ বুদ্ধিজীবীর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। গাজালির ভাষায়, নবীগণই হলেন সেই আত্মিক ব্যাধির চিকিৎসক:
“নবীগণ হলেন অন্তরের ব্যাধিসমূহের চিকিৎসক। আর মানববুদ্ধির প্রকৃত উপযোগিতা শুধু এইটুকুতেই যে সে আমাদের এই সত্যটি চিনিয়ে দেয়। বুদ্ধি নবুওয়তের সত্যতাকে স্বীকার করে এবং নবুওয়তের দৃষ্টিতে যা ধরা পড়ে, তা অনুধাবনের ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নেয়। বুদ্ধি আমাদের হাত ধরে নবুয়তের হাতে এমনভাবে সঁপে দেয়, যেভাবে একজন দৃষ্টিহীন মানুষ পথচলার জন্য পথপ্রদর্শকের ওপর নির্ভর করে, কিংবা একজন দিশাহারা রোগী নিজেকে সমর্পণ করে কোনো পরম স্নেহশীল চিকিৎসকের হাতে।” (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১০)
যখন তিনি নিজের অন্তরের রোগ সারিয়ে প্রশান্তি লাভ করলেন, তখন বাইরের সমাজের দিকে তাকিয়ে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পেলেন। মানুষের ইমান ভেঙে পড়ছে এবং ধর্ম পালনে চরম উদাসীনতা নেমে এসেছে। সমাজের গভীরে অনুসন্ধান চালিয়ে তিনি এই বিশ্বাসহীনতার পেছনে মূলত চারটি কারণ চিহ্নিত করেন:
১. দার্শনিকদের বিভ্রান্তিকর সংশয়বাদ
২. ভণ্ড সুফিদের ধর্মীয় বিধিনিষেধ অস্বীকার করার প্রবণতা
৩. গুপ্ত নির্দেশবাদী বাতেনি সম্প্রদায়ের বিভ্রান্তি
৪. আলেম সমাজের নৈতিক স্খলন ও কপটতা। (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১২)
সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি দেখলেন, তারা ধর্মীয় বিধানে অবহেলা করছে। যখন তিনি তাদের পরকালের ভয় দেখাতেন, তখন তারা সমাজের আলেমদের পাপাচারের কথা বলত। গাজালি সেই সমাজচিত্র তুলে ধরে লিখছেন:
“উত্তরে কেউ কেউ বলত: এটি যদি এমন কোনো বিষয় হতো, যা মেনে চলা জরুরি, তবে আলেমদের পক্ষেই তা পালনের সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধতা থাকত। অথচ দেখুন, জ্ঞানীদের মাঝে অমুক বিখ্যাত পণ্ডিত তো নামাজই পড়েন না; অমুক ব্যক্তি মদ পান করেন; অমুক আলেম ওয়াকফর সম্পত্তি ও এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করেন; অমুকজন হারাম-হালালের পরোয়া না করে রাজদরবারের দান-অনুদানে বিলাসিতা করেন; আর অমুক বিচারক ঘুষ গ্রহণ করেন!।” (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১২)
যখন মহামারি সমাজে সর্বব্যাপী রূপ নেয়, স্বয়ং চিকিৎসকেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়, তখন তাঁর একাকী নির্জনবাসের সার্থকতা কোথায়?
আরেক শ্রেণির মানুষের অহংকার দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন, যারা দর্শনের ভুল পাঠের কারণে নিজেদের সব জবাবদিহির ঊর্ধ্বে মনে করত। এমন এক ব্যক্তির চিত্রায়ণ করতে গিয়ে গাজালি লেখেন:
“অহংকারের সঙ্গে কেউ কেউ বলে: আমি তো আর সাধারণ মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত নই যে আমাকেও বিধিবিধানের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে হবে! আমি তো বিজ্ঞ দার্শনিকদের একজন; আমি প্রজ্ঞার পথ অনুসরণ করি। উপাসনা-পদ্ধতিগুলোর মূল উদ্দেশ্য তো শুধু সাধারণ অজ্ঞ জনগণকে মারামারি ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা!।” (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১৩)
এমনকি চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনার মতো ব্যক্তিত্বের আত্মপ্রবঞ্চনাকেও গাজালি কঠোর ভাষায় চিহ্নিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইবনে সিনা অসিয়ত করে গিয়েছিলেন তিনি ধর্মীয় বিধান মানবেন এবং মদ পান করবেন না; শুধু রোগ নিরাময়ের পথ্য হিসেবে তা গ্রহণ করবেন। গাজালির মতে, ইমানের সীমায় পৌঁছেও তাদের নিষ্ঠার দৌড় ছিল রোগমুক্তির অজুহাতে মদ্যপানকে বৈধ রাখা।
চারপাশের এই নৈরাজ্য দেখে গাজালির আত্মা কেঁপে উঠল। তিনি যে জ্ঞান ও যুক্তি আয়ত্ত করেছিলেন, তা দিয়ে এই বিভ্রান্তি দূর করা তাঁর ভাষায় ‘এক ঢোঁক পানি পানের চেয়েও সহজ’। তিনি তখন তীব্র আত্মদংশনে ভুগতে লাগলেন। তাঁর নিজের ভাষায়:
“যখন মহামারি সমাজে সর্বব্যাপী রূপ নেয়, স্বয়ং চিকিৎসকেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়, তখন তোমার এই একাকী নির্জনবাসে দিন কাটানোর সার্থকতা আর কোথায়?” (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১৪)
প্রথমে তিনি ইতস্তত করেছিলেন। মনে হয়েছিল, একা একজন মানুষ কীভাবে একটি যুগের সমস্ত অধঃপতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, যেখানে যুগটাই মিথ্যার দখলে। কিন্তু তৎকালীন সেলজুক উজির ফখরুল মুলক যখন কোনো পূর্বপ্ররোচনা ছাড়াই নিশাপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায় দরস দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় নির্দেশ জারি করলেন, তখন গাজালি বুঝতে পারলেন এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। তাঁর মনে হলো, নিজের আরাম, নিঃসঙ্গতার প্রশান্তি কিংবা মানুষের কটূক্তি এড়ানোর ভয় আসলে আধ্যাত্মিক অলসতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাসুলদেরও তো অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাঁরা ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।
সমকালীন আধ্যাত্মিক মনীষীদের সঙ্গে পরামর্শ এবং শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে ধর্মের পুনরুজ্জীবনের (মুজাদ্দিদ) ভবিষ্যদ্বাণী তাঁকে নিশ্চিত করল যে এবার ফেরার সময় এসেছে। গাজালি ফিরলেন ঠিকই, কিন্তু যে মানুষটি বাগদাদ ছেড়েছিলেন এবং যে মানুষটি নিশাপুরে ফিরলেন, তাঁরা এক ব্যক্তি ছিলেন না। এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রূপান্তর। এই প্রত্যাবর্তনের আধ্যাত্মিক রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে তিনি লেখেন:
“আমি খুব ভালো করেই জানি, দৃশ্যত আমি আবারও জ্ঞান প্রসারের কাজে ফিরে এলেও বাস্তবে আমি আগের সেই জীবনে আদৌ ফিরে যাইনি। কারণ, “ফিরে যাওয়া”র প্রকৃত অর্থ হলো আগের অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা। সেই অতীতে আমি এমন জ্ঞান প্রচার করতাম, যার মাধ্যমে সামাজিক প্রতিপত্তি ও পদমর্যাদা অর্জিত হতো; আমার কথা ও কাজের মাধ্যমে আমি মানুষকে সেদিকেই ডাকতাম এবং সেটাই ছিল আমার আসল উদ্দেশ্য ও নিয়ত। পক্ষান্তরে আজ আমি মানুষকে এমন জ্ঞানের দিকে আহ্বান করছি, যা মানুষকে জাগতিক পদমর্যাদা ত্যাগের দীক্ষা দেয় এবং ক্ষমতার মোহের অন্তঃসারশূন্যতা চিনিয়ে দেয়।” (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১৬)
যে আত্মশুদ্ধি মানুষের কান্নায় আর্দ্র হতে শেখায় না, সে সাধনা অর্থহীন। তিনি ফিরে এসেছিলেন নিজের সমস্ত খ্যাতি ধ্বংস করে অন্যের অন্তরে বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালাতে। ইমাম গাজালির এই প্রত্যাবর্তন ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি আমাদের শেখায়, পরম সত্য ও আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের জন্য সাধনা ও নির্জনতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য; কিন্তু সেই প্রশান্তিকে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতায় রূপ দেওয়া কোনো খাঁটি সাধকের কাজ হতে পারে না।
যখন সমাজ পথ হারায়, কুযুক্তি বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে আঘাত হানে এবং মানুষ অন্ধকারে হাবুডুবু খায়, তখন নিজের মুক্তি নিশ্চিত করে পাহাড়ে বা নির্জন কক্ষে লুকিয়ে থাকাকে আধ্যাত্মিকতা বলা যায় না। বরং নিজের সমস্ত অহং বিসর্জন দিয়ে, ভাঙা তরী নিয়ে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়াই হলো প্রকৃত ইমান।
নিশাপুরের ধূলিমাখা রাজপথে পা রেখে ইমাম গাজালি আমাদের সামনে উন্মোচন করে দিয়ে গেছেন যে, যে আত্মশুদ্ধি মানুষের কান্নায় আর্দ্র হতে শেখায় না, সে সাধনা অর্থহীন। তিনি ফিরে এসেছিলেন নিজের সমস্ত খ্যাতিকে ধ্বংস করে দিয়ে অন্যের অন্তরে বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালাতে; আর তাঁর অন্তরের গভীর থেকে ধ্বনিত হয়েছিল সেই অমর আকুতি:
“আমি আল্লাহর দরবারে মিনতি জানাই, তিনি যেন প্রথমে আমাকে সংশোধন করেন, অতঃপর আমার মাধ্যমে অন্যদের সংশোধন করেন; তিনি যেন প্রথমে আমাকে হেদায়াত দান করেন, অতঃপর আমার মাধ্যমে অন্যদের সুপথ প্রদর্শন করেন; তিনি যেন সত্যকে আমার কাছে সত্য রূপেই উদ্ভাসিত করেন এবং তা অনুসরণের তাওফিক দান করেন; আর মিথ্যাকে মিথ্যা রূপেই স্পষ্ট করে দেন এবং তা পরিহার করার সামর্থ্য দান করেন।” (আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, পৃষ্ঠা: ১১৬)
(বিস্তারিত দেখুন: আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল, আবু হামিদ আল-গাজালি, পৃষ্ঠা: ১১০-১১৬, মাতবাআতুল জামিয়াতিস সুরিয়্যাহ)
আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও প্রোগ্রামার
[email protected]