বছর ঘুরে আবারও আমাদের সামনে হাজির হতে যাচ্ছে পবিত্র মাস রমজান। ক্যালেন্ডারের পাতায় তাকালে মনে হতে পারে এখনো অনেক সময় বাকি, কিন্তু আত্মিক ও মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করার কথা চিন্তা করলে দেখা যায় সময় আসলে খুব সীমিত। সাধারণত আমাদের মাঝে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে, রমজানের প্রস্তুতি বলতে আমরা কেবল কেনাকাটা, ইফতারের আয়োজন কিংবা শাবান মাস চলে এলে হঠাৎ করে কোরআন পাঠ ও নফল নামাজের সংখ্যা বাড়ানোকেই বুঝি।

তবে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, যেসব গভীর আত্মিক ক্ষত নিয়ে আমরা রমজানের পবিত্র আঙিনায় প্রবেশ করি, সেগুলোর সমাধান শেষ মুহূর্তের দুই-এক সপ্তাহের বাহ্যিক ব্যস্ততার মাধ্যমে সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে লালন করা ক্ষোভ, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের তিক্ততা এবং অন্তরের কঠোরতা দূর করতে দীর্ঘ অনুশীলনের প্রয়োজন হয়। মনের গভীরে চেপে রাখা পুরোনো অভিমান ও হিংসা রাতারাতি হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না। তাই রমজানের প্রকৃত বরকত ও আত্মিক প্রশান্তি অর্জন করতে হলে প্রথাগত অভ্যাসের বাইরে গিয়ে অনেক আগে থেকেই অন্তরের পরিশুদ্ধির কাজ শুরু করতে হবে।

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে রমজানের প্রস্তুতি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতার হিসাব নয়, বরং এটি হলো অন্তরের একটি বিশেষ জাগরণ। ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পূর্বসূরি মনীষীরা রমজানের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিতেন। ইবনে রজব আল-হাম্বলি উল্লেখ করেছেন যে রমজানের আগের মাসগুলোতে সাহাবি ও তাবেয়িরা আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন যেন তাঁরা রমজান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন। (আল-হাম্বলি, লাতায়েফ আল-মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ২৬৪, দারুল মআরিফ, কায়রো, ১৯৮৪)

রমজানের আগমুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হওয়া উচিত মনের ভেতরের জঞ্জাল পরিষ্কার করা। রাগ, অহংকার, হিংসা এবং পরনিন্দা মানুষের অন্তরকে শক্ত ও অনুভূতিহীন করে তোলে। আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমেই রমজানের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়। কোরআনে রোজা ফরজ করার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে তাকওয়া অর্জনের কথা বলা হয়েছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩)

এই খোদাভীতি একদিনে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন ও মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। রমজানের আগমুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হওয়া উচিত মনের ভেতরের জঞ্জাল পরিষ্কার করা। রাগ, অহংকার, হিংসা এবং পরনিন্দা মানুষের অন্তরকে শক্ত ও অনুভূতিহীন করে তোলে। ইমাম গাজালির মতে, অন্তরের রোগগুলো নিরাময় না করে শুধু বাহ্যিক ইবাদত দিয়ে প্রকৃত রুহানিয়াত অর্জন করা যায় না। (আল–গাজালি, ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন, ৩/৫২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০৫)

তাই এই সময়ে বিশেষ তিনটি কাজে মনোনিবেশ করতে হবে:
১. পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কে ঘটে যাওয়া দূরত্ব ঘুটিয়ে ফেলা।
২. মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ ও অভিমান নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা।
৩. নিজের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে নিয়মিত ক্ষমা প্রার্থনা করা।

হাদিসে এসেছে, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা ক্ষমার পথে বড় বাধা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৫)—যেখানে পারস্পরিক ক্ষমার বিশেষ ফজিলতার কথা বলা হয়েছে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ক্ষমাশীল হওয়ার তাগিদ দেয়।

অন্যদিকে, যারা রমজানে পবিত্র মক্কা ও মদিনার পরশে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এখন থেকেই ছুটি, অর্থ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় গুছিয়ে নেওয়া উচিত। হঠাৎ করে রমজানে রাত জাগা, সেহরির জন্য ওঠা এবং দীর্ঘ তারাবি পড়ার অভ্যস্ততা গড়ে তোলা শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এখন থেকেই ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

নফল রোজা: রজব ও শাবান মাসের সুন্নাত রোজাগুলোর মাধ্যমে শরীরকে অভ্যস্ত করা। ড. ইউসুফ আল-কারজাভি তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে রমজানের আগের নফল রোজাগুলো ইবাদতের একটি মানসিক স্থায়িত্ব তৈরি করে। (আল-কারজাভি, আল-ইবাদাত ফি আল-ইসলাম, পৃষ্ঠা: ২১২, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)

কোরআন পাঠ: প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা করে কোরআন তিলাওয়াত ও এর অর্থ অনুধাবনের অভ্যাস শুরু করা, যাতে রমজানে এসে তা বোঝা মনে না হয়।

সময় ব্যবস্থাপনা: অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা স্ক্রিনটাইম কমিয়ে ইবাদত ও আত্মমূল্যায়নের জন্য আলাদা সময় বের করা।

ওমরাহর প্রস্তুতি: যারা রমজানে পবিত্র মক্কা ও মদিনার পরশে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এখন থেকেই ছুটি, অর্থ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় গুছিয়ে নেওয়া উচিত।

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ রমজান শুরু হতে পারে। বাকি মাত্র ১২০ দিন। আসন্ন রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, এটি জীবনের গতিপথ বদলানোর এক মোক্ষম সুযোগ। এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে ১২০ দিন আগের এই সময়টি অত্যন্ত মূল্যবান। জীবনের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়, যাতে রমজান এলে আমরা শুধু রুটিনমাফিক কাজ না করে প্রকৃত আত্মিক প্রশান্তি ও মুক্তির সুবাতাস অনুভব করতে পারি।