শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সেদিন সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে মুক্তকণ্ঠের অফিসে হাজির হলাম। দেখলাম সম্পাদক মতিউর রহমান ব্যস্ত। তাঁর সামনে বসে আছেন শিল্পী মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন। গত বছর ১৮ ডিসেম্বর পরিকল্পিত সন্ত্রাসের শিকার মুক্তকণ্ঠের পুড়ে যাওয়া ভবন নিয়ে একটি প্রদর্শনীর কাজ চলছিল। শিল্পী ও শিল্পের কাজের মধ্যে গিয়ে পড়ায় এ বিষয়েই শুরু হলো আমাদের আলাপ। একপর্যায়ে জানতে চাইলাম, পাবলো পিকাসো কেন আপনার প্রিয় শিল্পী? আর তাতেই খুলে গেল সম্পাদকের গল্পের ঝাঁপি।

হেসে বললেন, কঠিন প্রশ্ন করলেন। আমি বরাবরই মনে করি, শিল্পীরা অন্য মানুষের চেয়ে অনেক বেশি মানবিক। সেটা একটা কারণ। তবে পিকাসোকে ভালো লাগার বহু কারণ আছে। বিশেষ করে ১৯৩৭ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় তাঁর আঁকা ম্যুরাল ‘গোয়ের্নিকা’, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং তাঁর আঁকা ‘শান্তির কপোত’ আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তিনি ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে সারা বিশ্বে শান্তির বার্তা দিয়েছিলেন। আবেদনপত্রে তিনি বলেছিলেন, ফ্রান্সের সেরা মানুষগুলো, যাঁরা নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাঁরা কমিউনিস্ট ছিলেন। অবশ্যই তাঁর চিত্রকর্মগুলো এবং তাঁর এ বর্ণিল বহুমুখী জীবন আমাকে সব সময় আকর্ষণ করে।’

সম্পাদক হেসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি গণসাহিত্য ম্যাগাজিনে আমাদের পাবলো পিকাসো সংখ্যাটা পড়েছেন? ওখানে আমি ‘ছবির কবিতা, কবিতায় ছবি’ শিরোনামে একটি বড় প্রবন্ধ লিখেছিলাম। পিকাসোর মৃত্যুর পর ১৯৭৩ সালের মে–জুনে গণসাহিত্য মাসিক পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা বের করেছিলাম আমরা।

সম্পাদক বলেছিলেন, প্যারিসে থাকাকালীন পিকাসোর সঙ্গে কবিদের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তাঁর ছবিতে কবিবন্ধুদের কবিতার প্রভাব যেমন ছিল, তেমনি সেই কবিদের লেখাতেও ছিল পিকাসোর শিল্পের প্রতিফলন। ফ্রান্সের তিনজন শ্রেষ্ঠ কবি—গিয়োম আপোলিনের, ম্যাক্স জ্যাকব এবং পল এলুয়ার ছিলেন পিকাসোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে সময় প্যারিসে কবি ও শিল্পীদের বড় একটি অংশ একদিকে অনন্য সব সৃষ্টিকর্ম গড়ছিলেন, অন্যদিকে তাঁরা প্রগতিশীল বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। পিকাসো ১৯০৪ সাল থেকে জীবনের প্রায় পুরোটা সময় প্যারিসে থাকলেও নিজেকে গণতান্ত্রিক স্পেনের নাগরিক মনে করতেন। আবার একই সঙ্গে ছিলেন ফ্রান্সের হৃদয়ের একান্ত আপনজন।

সম্পাদক হেসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি গণসাহিত্য ম্যাগাজিনে আমাদের পাবলো পিকাসো সংখ্যাটা পড়েছেন? ওখানে আমি ‘ছবির কবিতা, কবিতায় ছবি’ শিরোনামে একটি বড় প্রবন্ধ লিখেছিলাম। পিকাসোর মৃত্যুর পর ১৯৭৩ সালের মে–জুনে গণসাহিত্য মাসিক পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা বের করেছিলাম আমরা।

মাদ্রিদে যদি আধুনিক শিল্পকলার প্রদর্শন দেখতে চান, তবে ‘মুসিও রেইনা সোফিয়া’ মিউজিয়ামে অবশ্যই যেতে হবে। এই মিউজিয়ামে পিকাসোর কাজগুলোই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, বিশেষ করে তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ ‘গোয়ের্নিকা’। এটি স্পেনীয় গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা আর সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। পিকাসো চেয়েছিলেন দেশ পুরোপুরি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক না হওয়া পর্যন্ত এই ছবি স্পেনে পাঠানো হবে না। ১৯৩৯ থেকে ১৯৮১ সাল সময়ে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হয়েছে। স্পেনে ফ্যাসিস্ট ফ্রাঙ্কোর পতনের পর এটি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল।

গোয়ের্নিকা খুব সহজে রাজনৈতিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। এটা কোনো এক দেশের গল্প না। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন সব সময় শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখেছে। আর পিকাসোর এই কাজটা ছিল ঠিক সেই রকম—শব্দ ছাড়াই শক্ত বার্তা দেয়। তাই কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা ‘গোয়ের্নিকা’কে নিজেদের করে নিয়েছিল। ফলে গোয়ের্নিকা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে যুদ্ধ আর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের এক আইকন। এটি আর কেবল একটি ছবি থাকেনি, বরং যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক বিশ্বজনীন প্রতিবাদের প্রতীক উঠেছিল।

আমরা জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পিকাসো ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। আমি সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হলাম তখনই, যখন পিকাসোর সেই বিখ্যাত লেখা ‘হোয়াই আই বিক্যাম আ কমিউনিস্ট’ চোখে পড়ল। ১৯৪৪ সালে রচিত এই লেখাটি কেবলবার্তার মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল দ্য নিউ মাসেস নামের প্রকাশনায়। সেই লেখায় পিকাসো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে ব্যক্তিগত জীবন ও শিল্পচর্চার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

কী লিখেছিলেন পিকাসো, যে কারণে মতিউর রহমান এত অনুরক্ত হয়েছিলেন? সে লেখায় পিকাসো লিখেছিলেন:

‘কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়া আমার জীবনের একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ। এটি আমার জীবন ও শিল্পকর্মকে অর্থ দিয়েছে। নকশা ও রঙের মাধ্যমে আমি পৃথিবী ও মানুষের জ্ঞানকে গভীরভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করেছি, যাতে সেই জ্ঞান আমাদের মুক্ত করতে পারে। আমি আমার নিজস্ব উপায়ে সব সময়ই যা সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে ন্যায়সংগত ও সবচেয়ে উত্তম বলে মনে করেছি, তা-ই বলেছি এবং তা–ই ছিল সবচেয়ে সুন্দর। কিন্তু নিপীড়ন ও বিদ্রোহের সময় আমি অনুভব করেছি, শুধু এটুকু যথেষ্ট নয়; এখন আমাকে কেবল চিত্রকলার মাধ্যমে নয়, আমার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়েই লড়তে হবে।’

১৯৬৮ সালের কথা। ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের উল্টো দিকে সাকুরা হোটেলের নিচে ব্যবসায়ী ও শিল্পসংগ্রাহক ওবায়েদ জায়গীরের একটি দোকান ছিল। সেখানে বিদেশি শিল্পীদের রিপ্রোডাকশন পাওয়া যেত। মাত্র ৩৫ টাকা দিয়ে পিকাসোর বিখ্যাত ছবি ‘গার্ল বিফোর আ মিরর’-এর একটি বড় রিপ্রোডাকশন সংগ্রহ করেছিলাম।

পিকাসোর দৃষ্টিতে কমিউনিজম ছিল স্বাধীনতা ও মানবমুক্তির একটি সক্রিয় পথ। একই লেখায় তিনি আরও লিখেছেন:

‘আমি কমিউনিস্ট হয়েছি, কারণ আমাদের পার্টি পৃথিবীকে জানতে ও গড়ে তুলতে, মানুষকে আরও স্পষ্ট চিন্তাশীল, আরও স্বাধীন এবং আরও সুখী করে তুলতে অন্য যেকোনো পার্টির চেয়ে বেশি চেষ্টা করে ।’

যদিও পরে বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহুবিধ কারণে ভেঙে পড়ে। এখানে মতিউর রহমান নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ছাত্র অবস্থায় আমি দেশি-বিদেশি কবি, সাহিত্যিক আর শিল্পীদের নিয়ে থাকতাম। কবি হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, যদিও হতে পারিনি (হাসি)। ১৯৬৮ সালের কথা। ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের উল্টো দিকে সাকুরা হোটেলের নিচে ব্যবসায়ী ও শিল্পসংগ্রাহক ওবায়েদ জায়গীরের একটি দোকান ছিল। সেখানে বিদেশি শিল্পীদের রিপ্রোডাকশন পাওয়া যেত। মাত্র ৩৫ টাকা দিয়ে পিকাসোর বিখ্যাত ছবি ‘গার্ল বিফোর আ মিরর’-এর একটি বড় রিপ্রোডাকশন সংগ্রহ করেছিলাম।

আরেকটি স্মৃতি খুব মনে পড়ে—১৯৬৯ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মঞ্চের পেছনে শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী ও প্রাণেশ কুমার মণ্ডলের আঁকা গোয়ের্নিকার এক বিশাল প্রতিচিত্র ছিল। প্রবেশপথের গেটের নকশা করেছিলেন শিল্পী রফিকুন নবী। সেখানেও ছিল গোয়ের্নিকার কতগুলো ছোট ছোট অংশের প্রতিচ্ছবি। সেই অগ্নিঝরা সময়ে গোয়ের্নিকার চেয়ে প্রাসঙ্গিক ছবি আর কী হতে পারে?

স্মৃতি হাতড়ে তিনি পিকাসোর প্যারিসে কাটানো সময় নিয়ে বলা শুরু করলেন। কথায় কথায় পিকাসো, মায়াকোভস্কি, লুই আঁরাগ, পল এলুয়ার, আমেদো মোদিলিয়ানিসহ অনেকের প্রসঙ্গ এসে যায়।

‘পিকাসোর জন্ম ১৮৮১ সালে স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের মালাগা নামে একটি শহরে। যে বাসায় তাঁর জন্ম, সেখানে গিয়েছিলাম। যেবার আমি স্পেনের বার্সালোনায় যাই, সেবার মালাগায় একদিনের জন্য গিয়েছিলাম শুধু তার জন্মস্থান দেখতে। সেদিনটি ছিল সোমবার। পিকাসোর জন্মস্থান, বাড়ি ও স্কুলে আমি গিয়েছিলাম। সমাধি ঘরজুড়ে তাঁর আকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী।’

১৮৯৭ কিছু সময়ের জন্য তিনি মাদ্রিদে, পরে ১৮৯৯ সালে বার্সেলোনাতেও আর্ট শেখেন। বার্সেলোনায় থাকাকালীন তিনি স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। সেই দলের মধ্যে ছিলেন কাতালান কার্লোস কাসাগেমাস, যিনি পরে পিকাসোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যান।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ‘গত শতাব্দীর শুরুতে পিকাসো ও কাসাগেমাস প্যারিসে চলে যান। সেখানে মঁমার্ত্রে এলাকায় একটি স্টুডিও খোলেন। সেখানেই শুরু হয় পিকাসোর বোহেমিয়ান জীবনের নতুন অধ্যায়, যা তাঁর শিল্পকর্মের ওপর ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। কাসাগেমাস ব্যর্থ প্রেমের কারণে আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যু পিকাসোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, যা “ব্লু পিরিয়ড” চিত্রকর্মে প্রতিফলিত হয়। পিকাসো লিখেছিলেন, কাসাগেমাস মারা গেছে বুঝে আমি নীল রঙে চিত্রাঙ্কন শুরু করি।’

মতিউর রহমান বলেন, ‘প্যারিসে গিয়ে মঁমার্ত্রে ঘুরে ঘুরে সেই ক্যাফেগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি যেখানে পিকাসোসহ বড় বড় শিল্পীরা আড্ডা দিতেন। যেমন ‘ক্যাফে দো রোতোন্দে’ প্যারিসের মঁমপার্নাস এলাকায় অবস্থিত একটি বিখ্যাত ক্যাফে। এই ক্যাফেতে ‘প্লেস দ্যু পিকাসো’ নামে একটি জায়গাও আছে। খোলা পরিবেশ এবং যুক্তিসংগত দাম থাকায় বিখ্যাত শিল্পী ও লেখকেরা এখানে সময় কাটাতেন। পিকাসো ১৯১৪ সালের দিকে এখানে আসতেন। তাঁর স্টুডিও কাছাকাছি হওয়ায়, তিনি দিন-রাত এই ক্যাফেতে শিল্পী ও কবিবন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, যেমন দিয়েগো রিভেরা, ফেদেরিকো কান্তু, ইলিয়া এহরেনবার্গ এবং সুগুহারু ফুজিতা। মোদিলিয়ানির সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যান। আজও রোতোন্দের ভেতরে আমেদো মোদিলিয়ানির অনেক ছবি আছে।’

মোদিলিয়ানির প্রসঙ্গ আসতেই লুহানীকে নিয়ে মতিউর রহমানের লেখা ‘গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী: এক অজানা বিপ্লবীর কাহিনী’ বইয়ের কথাও উঠে এল। আমি বললাম, কীভাবে আমি আর খলিলউল্লাহ্ খুঁজে খুঁজে প্যারিসে লুহানির ভাড়া বাসা, মোদিলিয়ানির বাড়ি বের করেছি, ছবি তুলেছি।

১৯১৪–১৯২৫ সময়ে লুহানী ইউরোপে থাকতেন। লন্ডনে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিক আন্দোলন ও ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যাপকভাবে যুক্ত হন। রাশিয়ার ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯২১ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসে অংশ নেন। ভ্লাদিমির লেনিনের সঙ্গে চিঠিপত্রও বিনিময় করেন। ১৯২৫ সালে তিনি স্থায়ীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে যান। সেখানে অনুবাদক, গবেষক ও অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন এবং ভারতের সমাজ ও বিপ্লবী কৌশল নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৩৮ সালে স্টালিনের আমলে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা এনকেভিডি লুহানীকে গুপ্তচরবৃত্তির মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১৯৫৭ সালে তিনি মৃত্যুর পর পুনর্বাসিত হন (নির্দোষ প্রমাণিত হন)।

নিউইয়র্কে একবার শিল্পকলার এক দোকানে পিকাসোর একটি ছবি ছাপচিত্র ‘শ্বেত কপোত’ দেখেছিলাম। দোকানদার দাম চাইল ৫ হাজার ডলার। আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম ‘এটা কি অরিজিনাল?’ সে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করল—‘তুমি কি এটা কিনবে?’ ওই সময় এত টাকা দিয়ে ছবি কেনা কল্পনাও করতে পারি না। সেটা ছিল ১৯৯৬ সালের ঘটনা।

সেই লুহানীর স্ত্রী ছিলেন ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার ও মডেল গ্যাব্রিয়েল সোয়েন। তিনি শিল্পী আমেদো মোদিলিয়ানির মডেল হিসেবে কাজ করেছেন।

রোতোন্দে ক্যাফের অনেকেই আজ সারা বিশ্বে সুপরিচিত। এখানে বহু বিখ্যাত ব্যক্তি এসেছেন, পিকাসো ছাড়াও যেমন কবি গিয়োম আপোলিনের, ম্যাক্স জ্যাকব, আমেদো মোদিলিয়ানি এবং আরও অনেকে। ১৯২৪ সালে মায়াকোভস্কি লিখেছিলেন, ‘রোতোন্দের জানালার বাইরে উঠে বেগুনি পারি, বর্ণাঢ্য পারি [প্যারিস] …।’

মায়াকোভস্কির প্রসঙ্গ আসতেই মতি ভাই রুশ এই সাহিত্যিকের জীবনের নানা দিক নিয়ে আলাপ জমিয়ে তুললেন, তিনি বলেন, ‘মায়াকোভস্কি ১৯২০-এর দশকে ইউরোপ ভ্রমণে বের হন মূলত সমকালীন শিল্পকে কাছ থেকে দেখার জন্য। প্যারিস তাঁকে খুব আলোড়িত করেছিল। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি পিকাসোর স্টুডিওতেও গিয়েছিলেন। মায়াকোভস্কির জীবন ছিল বিপ্লবী উদ্দামে ভরা। তাঁর জীবনে চারজন নারী গভীর ছাপ রেখে গেছেন—লিলিয়া ব্রিক, প্যারিসের তাতিয়ানা, ভেরোনিকা পোলনস্কায়া আর আমেরিকার এলি জোনস। লিলিয়া ব্রিক ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তার ছোট বোন প্রখ্যাত ফরাসি লেখক লুই আঁরাগ জীবনসঙ্গী এলসা ত্রিয়োলেও ছিলেন মাপকোস্কির বন্ধু। আবার এলি জোনসের সঙ্গে তাঁর এক গোপন কন্যাসন্তানও ছিল, যা নব্বইয়ের দশকে প্যাট্রিসিয়া থম্পসনের লেখা বই থেকে সবাই জানতে পারে। মায়াকোভস্কির এই প্রেম আর যন্ত্রণাই তাঁর সৃষ্টির মূল শক্তি ছিল।’

এরপর মতি ভাই আবারও পিকাসোর প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলেন, ‘পিকাসোর জীবনে একেকজন নারী মানে একেকটা শৈল্পিক অধ্যায়। ১৯০৪ সালে প্রথম বড় প্রেম ফার্নান্দে অলিভিয়েরের সময় ছিল ‘রোজ পিরিয়ড’। ১৯১৮ সালে বিয়ে করেন রুশ ব্যালারিনা ওলগা খখলোভাকে। পরে সম্পর্কের অবনতি হলে ওলগার যে ছবিগুলো তিনি আঁকেন, সেখানে একধরনের হিংস্রতা ফুটে ওঠে।

আবার ১৭ বছরের মারি-তেরেস ওয়াল্টারের স্নিগ্ধতা পিকাসোর কাজে নতুন রঙের উষ্ণতা নিয়ে এসেছিল। পরে আসেন সুররিয়ালিস্ট ফটোগ্রাফার ও শিল্পী ডোরা মার, যিনি গোয়ের্নিকা তৈরির সময় পিকাসোর পাশে ছিলেন। তারপর ফ্রাঁসোয়াজ জিলো আবার নিজের ব্যক্তিত্ব ধরে রেখে পিকাসোকে ছেড়ে যেতে পেরেছিলেন। একদম শেষ বয়সের সঙ্গী ছিলেন জ্যাকলিন রোক, যাঁকে নিয়ে পিকাসো ৪০০-এর বেশি ছবি এঁকেছেন। তবে এই সম্পর্কগুলোর পরিণতি সব সময় সুখের হয়নি। পিকাসো মারা যাওয়ার পর জ্যাকলিন থেকে আর মারি-তেরেস—দুজনই আত্মহত্যা করেছিলেন। পিকাসোর ছেলে পাওলো আর নাতি পাবলিটোর জীবনও ছিল বিষাদময়। প্রেম, কষ্ট আর ট্র্যাজেডির এক জটিল মিশ্রণ ছিল পিকাসোর জীবন।

এ পর্যায়ে মতি ভাই তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের গল্প বলেন। অবাক করা ব্যাপার হলো তিনি পিকাসোর এতই ভক্ত যে এই শিল্পীর ওপর তাঁর কাছে ৮২টি ছোট–বড় প্রকাশনা রয়েছে। বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, প্যারিস বা নিউইয়র্কে যেসব মিউজিয়ামে গিয়েছেন, সেখানে পিকাসোর নানা স্মারক সংগ্রহ করেছেন। এখনো করেন। নিউইয়র্কের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন:

নিউইয়র্কের একবার শিল্পকলার এক দোকানে পিকাসোর একটি ছবি ছাপচিত্র ‘শ্বেত কপোত’ দেখেছিলাম। দোকানদার দাম চাইল ৫ হাজার ডলার। আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম ‘এটা কি অরিজিনাল?’ সে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি এটা কিনবে?’ ওই সময় এত টাকা দিয়ে ছবি কেনা কল্পনাও করতে পারি না। সেটা ছিল ১৯৯৬ সালের ঘটনা।

অথচ দেখুন, শিল্পীরা বেঁচে থাকতে নিজেদের ছবির মূল্য পান না। পিকাসোর স্ত্রী ওলগার যখন খুব জ্বর, তখন প্রচণ্ড শীতে ঘর গরম করার জন্য ফায়ারপ্লেসের কয়লা কিনতে হতো। পিকাসোর কাছে নেই কোনো টাকা। উপায় না পেয়ে পিকাসো নিজের ৪-৫টি ছবি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। মাত্র ২৫–৩০ ফ্রাঙ্ক (ফরাসি মুদ্রা) মূল্যে বিক্রি করে তেল নিয়ে ঘরে ফিরলেন। আজ সেই ছবির মূল্য অনেক অনেক!

অন্যদিকে, রোতেন্দে ক্যাফের টেবিলে বসেই আমেদো মোদিলিয়ানি ছবি আঁকতেন। মাত্র এক গ্লাস বিয়ারের বিনিময়ে অনায়াসে, প্রায় উদাসীন ভঙ্গিতে, নিজের সৃষ্টিকর্ম অন্যের হাতে তুলে দিতেন।

আশা করি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছি। আসলে পিকাসোকে নিয়ে গল্প তো শেষই হয় না—মায়াকোভস্কি, বার্সেলোনায় পিকাসো মিউজিয়াম, রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার খেলা দেখা, ফ্লামেঙ্কো নাচ, কত প্রসঙ্গ যে এসে যায়!

সম্পাদক মতিউর রহমান আবার ফিরে আসেন তাঁর প্রশ্নের উত্তরে।

‘এই গল্পগুলো, একজনের সাথে আর একজনের সংযোগগুলো আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। একটা গল্প থেকে আরেকটা গল্প খুঁজতে গিয়ে পিকাসোকে আরও ভালো করে জানার সুযোগ পেলাম। এটা সত্যি, প্রাথমিকভাবে যদি এভাবে সংযোগগুলোর পেছনে না ছুটতাম, হয়তো এতটা পিকাসো সম্পর্কে জানাই হতো না। তাই যখন দেশ-বিদেশ ঘুরেছি বা ইউরোপে গিয়েছি, পিকাসো–সম্পর্কিত কিছু না কিছু সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি। নানা সংগ্রহশালা বা মিউজিয়ামে তাঁর ছবি দেখেছি।’

বাইরে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পরের দিনের পত্রিকা বের করার ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। মতি ভাই তাঁর টিমের সঙ্গে পরের দিনের পত্রিকার খবর আর ছবি নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হয়ে গেলেন। আমার মনে হলো, সাগরময় ঘোষ তাঁর ‘সম্পাদকের বৈঠকের’ যে বর্ণনা দিতেন, যেন সেই দৃশ্যটাই সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

বিদায় নেওয়ার আগে মতি ভাই হেসে বললেন, অনেক সময় দিলেন আপনি। জানি না কেন এসেছেন—নিজের জন্য, আমার জন্য, না খলিলের জন্য?

আমি হেসে উত্তর দিলাম, সবগুলোর জন্যই।..তবে এখন মনে হচ্ছে আসলে এসেছি এই গল্পটার জন্য।