রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত 'বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন'-এর দ্বিতীয় দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে একটি নির্ধারিত বক্তৃতা প্রদান করেন মুক্তকণ্ঠর সম্পাদক মতিউর রহমান। ইংরেজিতে দেওয়া সেই বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদটি মুক্তকণ্ঠর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

বক্তৃতার শুরুতে মতিউর রহমান ৬৪ বছর আগের একটি স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, “আমি শুরুতেই ৬৪ বছর আগের একটা ঘটনা স্মরণ করতে চাই। ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছিল। সেদিনের অনেক দাবির মধ্যে একটি দাবি ছিল— কথা বলার অধিকার দিতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে।”

সেই ঐতিহাসিক বিক্ষোভ ও ধর্মঘটে তিনি নিজেও একজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। এরপর দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। গত ৫৫ বছরে দেশে বহু উত্থান-পতন ঘটেছে, বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং রাজনৈতিক পটভূমির পরিবর্তন হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশব্যাপী এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসন ও একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটে। স্বৈরশাসক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, যা ছিল এক অভাবনীয় ঘটনা। এরপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করে। সাধারণ মানুষের এই সরকারের প্রতি অনেক প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের হতাশ করেছে বলে মনে করেন মতিউর রহমান।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় ব্যর্থতার স্বাক্ষর বহন করছে। রাজনৈতিক ও সংবিধান সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো খুব বেশিদূর এগোয়নি এবং বিভিন্ন কমিশনের প্রস্তাবগুলো আলোর মুখ দেখেনি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। নানা চাপ ও ভয়ের মুখে অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা এবং সম্পাদক পরিবর্তন করা হয়। অনেক কর্মরত সাংবাদিককে তাদের চাকরি ছাড়তে হয়। মালিকপক্ষ নতুন সরকারের প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে তাদের অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসায়, যার ফলে পুরো প্রচারমাধ্যম এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও স্বনিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যায়।

মুক্তকণ্ঠর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, তারা এক চরম ভয়ের পরিবেশের মধ্য দিয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়েই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকি ও চাপের মুখে কাজ করতে হয়েছে। দেশ ও বিদেশ থেকে ডেইলি স্টার এবং মুক্তকণ্ঠর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়। সরকারের ভেতরে ও বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠী অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা চালিয়েছিল।

২০২৪ সালের নভেম্বরে মুক্তকণ্ঠর অফিসের সামনে উগ্রবাদীরা প্রায় সাত দিন ধরে বিক্ষিপ্ত সমাবেশ করে এবং গরু জবাই করে। এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর, যখন সারারাত ধরে মুক্তকণ্ঠর অফিসে আগুন দেওয়া হয়। লুটপাট ও সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যখন সব পুড়ে শেষ হয়ে গেল, তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফায়ার সার্ভিসকে ভেতরে ঢোকার পথ করে দেয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ, র‍্যাব বা সেনাসদস্যদের ধ্বংসযজ্ঞ রোধে কোনো কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়নি। দু-একজন উপদেষ্টা চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। সকাল হওয়ার আগেই ধ্বংসযজ্ঞ শেষ হয়। এরপর ডেইলি স্টার অফিসও অবরোধ ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, যেখান থেকে কর্মীদের অত্যন্ত কষ্টকর ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমাদের মনে আছে, সংসদে দাঁড়িয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মুক্তকণ্ঠ আওয়ামী লীগের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, দেশের শত্রু।” তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় অনুষ্ঠানে মুক্তকণ্ঠর সম্পাদক বা সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ২০০১ ও ২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি কেবল বিদ্বেষমূলক কথা বলেননি, বরং আক্রমণাত্মক ভাষাও ব্যবহার করেছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে উৎসাহজনক কথা বলা হলেও সংবাদমাধ্যমে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে একটি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যারা জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেয়। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মধ্যে এই প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে ইতিবাচক ঐকমত্য হলেও সরকার তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকার, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে বিএনপি বিশাল বিজয় লাভ করে এবং প্রায় ১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসে।

এখনকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ কোন পথ বেছে নেবে? বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

বিএনপির বিগত দুই মেয়াদে (১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬) যথাক্রমে ভোরের কাগজ ও মুক্তকণ্ঠর সম্পাদক হিসেবে তিনি অধিক স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। ২০০১-০৬ মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের ভুল নীতির কঠোর সমালোচনা করলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি এবং কোনো হয়রানি বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার তর্কের ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু তার জন্য কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তার ঘরোয়া ও সংবাদপত্রের পাতায় বিতর্ক হয়েছিল, যা পরবর্তীতে নিরসন হয়।

এর বিপরীতে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রতিষ্ঠানগতভাবে চরম আক্রোশের শিকার হন। শেখ হাসিনার সময়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ সংকুচিত করা হয়, মামলা দেওয়া হয় এবং অনেককে জেলে যেতে হয়। মুক্তকণ্ঠর সার্কুলেশন কমানোর চেষ্টা করা হয় এবং সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়। এমনকি ২০১৫ সালের আগস্টে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০টি বড় দেশি-বিদেশি কোম্পানির বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০০০ সালেও আওয়ামী লীগ সরকার সরকারি বিজ্ঞাপন ও অনলাইন সংস্করণ বন্ধ করে দিয়েছিল।

২০২৩ সালের ৩০ মার্চ তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। এক সময় তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা আশির কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যার কিছু এখনো আদালতে বিচারাধীন।

তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, “আমাদের মনে আছে, সংসদে দাঁড়িয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মুক্তকণ্ঠ আওয়ামী লীগের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, দেশের শত্রু।”

২০২৪ সালের শুরুতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মুক্তকণ্ঠর মালিকানা হস্তান্তরের জন্য কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়া। শেখ হাসিনার নির্দেশে অত্যন্ত নিন্দিত ও দুর্নামগ্রস্ত এক অর্থ পাচারকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে মালিকানা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সরকার আরও কয়েক মাস ক্ষমতায় থাকলে মুক্তকণ্ঠর ব্যবস্থাপনা ছিনিয়ে নেওয়া হতো এবং তার সম্পাদকের পদে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত।

আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংকটের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসায় তিনি আশাবাদী। বিশেষ করে তারেক রহমান ও বিএনপি সরকারের সহনশীল ও ইতিবাচক মনোভাবের প্রত্যাশা করেন। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচির ১১ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, “গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান ও সার্বিক সংস্কারের লক্ষে৵ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা হবে। সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার লক্ষে৵ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিএনপি নির্ভীক ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতার সুরক্ষা দেবে এবং বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনাকে স্বাগত জানাবে। সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি ব্যবস্থা এবং সাংবাদিক নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেল গঠনের কথা বলা হয়েছে।

তবে এসব প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সংস্কারের তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিল পরিশোধের আগ্রহ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি এবং মিডিয়া কমিশনের মতবিনিময় বৈঠকের পর আর কিছু শোনা যায়নি।

বিগত মাসগুলোতে কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের কথা শোনা গেছে। অনেক সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক অনিশ্চয়তা ও চাপের কথা বলছেন এবং মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণ বা অতিসতর্কতা অবলম্বন করছেন। স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কিছু আলোচনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইনের বর্তমান পরিস্থিতি সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

মতিউর রহমান মনে করেন, সরকার মাত্র সাত মাস পার করেছে, হাতে এখনো সময় আছে। তাই বিএনপি সরকারের উচিত সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম বিষয়ে জরুরি কাজগুলো শুরু করা, অন্যথায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সংকটে পড়বে। এই অবস্থায় তার মনে পড়ে ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সেই দাবির কথা, যখন বলা হয়েছিল, “কথা বলার অধিকার দিতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে।”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘ সময়ে সরকার ও রাজনৈতিক নেতা বদলেছে, কিন্তু মূল দাবিগুলো আগের জায়গাতেই স্থবির হয়ে আছে। সাংবাদিকতার ৫৬ বছরের ক্যারিয়ারের শেষে এসেও তাকে একই দাবি জানাতে হচ্ছে। সবশেষে তিনি প্রশ্ন করেন, এই স্বাধীনতার জন্য আর কতকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে?