গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও দেশে এখনো গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘটে অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, দীর্ঘ ৬৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তাঁকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য দাবি জানাতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বিএনপি সরকারের প্রতি গণমাধ্যম সংস্কারের জরুরি কাজগুলো এখনই শুরু করার জোরালো আহ্বান জানান।

আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত 'বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন'-এর দ্বিতীয় দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক নির্ধারিত বক্তৃতায় মতিউর রহমান এসব কথা বলেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে, যা আগামীকাল সোমবার শেষ হবে।

বক্তৃতার শুরুতেই মতিউর রহমান ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিগুলো তুলে ধরেন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কথা বলার অধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক বলেন, ‘সেই বিক্ষোভে আমি নিজেও অংশ নিয়েছিলাম। এরপর বহু আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও মূল বিষয়গুলো একই জায়গায় থেমে আছে। দুঃখ হলো সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়।’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসকের পতনকে একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন মতিউর রহমান। তবে তিনি মন্তব্য করেন যে, প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশবাসীকে অনেকটা হতাশ করেছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কিছু উদ্যোগ খুব বেশি দূর এগোয়নি এবং অনেক কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুযোগই পায়নি।

সেই সময়ে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল উল্লেখ করে মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক জানান, নানা চাপ ও ভয়ের মুখে অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মালিকানা পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক সম্পাদকের জায়গায় নতুন কেউ এসেছেন এবং বহু সাংবাদিককে তাঁদের কাজ ছাড়তে হয়েছে।

মুক্তকণ্ঠের নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মতিউর রহমান বলেন, পুরো সময়টি অত্যন্ত ভয়ার্ত পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দ্য ডেইলি স্টার ও মুক্তকণ্ঠের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশ থেকে পরিকল্পিতভাবে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মুক্তকণ্ঠের অফিসের সামনে প্রায় সাত দিন ধরে বিক্ষিপ্ত সমাবেশ চলে। এরপর ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রায় সারা রাত মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে আগুন জ্বালানো হয় এবং লুটপাট চালানো হয়।

তাঁর অভিযোগ, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সময়মতো এবং যথেষ্ট শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসেনি। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তাঁদের সরাসরি কোনো কঠোর নির্দেশ দেননি। এরপর ডেইলি স্টারের কার্যালয়ও একই উপায়ে অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার একটি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওই কমিশনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবের বিষয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক ও পরিচালকদের মধ্যে একটি ইতিবাচক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার তা বাস্তবায়নে ‘সামান্যতম’ উদ্যোগও নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শেখ হাসিনার শাসনকালে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ চরমভাবে সংকুচিত ছিল উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, অনেক সাংবাদিক ও সম্পাদককে জেলে যেতে হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মুক্তকণ্ঠের প্রচারসংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০টি দেশি-বিদেশি বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপনও বন্ধ করা হয়েছিল। মুক্তকণ্ঠ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা প্রায় ৮০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছিল।

মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক আরও জানান, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মুক্তকণ্ঠের মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার জন্য কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়া এবং মালিকানা একটি অর্থ পাচারকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া। তিনি দাবি করেন, এসব কিছুই শেখ হাসিনার নির্দেশেই করা হয়েছিল।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় ১৯ বছর পর বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসেছে। এই প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, ১৯৯১–’৯৬ ও ২০০১–’০৬ সালে বিএনপির দুই মেয়াদে তিনি প্রথমে ভোরের কাগজ এবং পরবর্তীতে মুক্তকণ্ঠের সম্পাদক ছিলেন। তখন সরকারের অনেক কঠোর সমালোচনা করেও তাঁকে কোনো হয়রানি বা আইনি ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর তর্কও হয়েছে, কিন্তু সে জন্য কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তখন তাঁর তর্ক হয়েছিল।

অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বিএনপি সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফার ১১ নম্বর দফায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে মিডিয়া কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ আছে। এছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারেও নির্ভীক সাংবাদিকতার সুরক্ষা এবং সাংবাদিক নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তবে মতিউর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, এত প্রতিশ্রুতির পর এখনো সংস্কারে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মিডিয়া কমিশন গঠন নিয়ে একটি মতবিনিময় বৈঠকের পর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং পুরোনো বিল পরিশোধের বিষয়েও কোনো উন্নতি নেই।

মতিউর রহমান আরও বলেন, কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে। অনেক সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অনিশ্চয়তা ও চাপের কথা বলছেন এবং সংবাদ ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কিছু প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বক্তব্য বর্তমানে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার মাত্র সাত মাস পার করেছে এবং হাতে এখনো যথেষ্ট সময় আছে, এই কথা বিবেচনা করে মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক বলেন, ‘দল ও সরকারকে এখনই সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যম বিষয়ের জরুরি কাজগুলো শুরু করতে হবে। নইলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।’

পরিশেষে মতিউর রহমান বলেন, ‘আমার সেই ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালের কথা বারবার মনে পড়ে যায়। সেদিন আমরা দাবি তুলেছিলাম, কথা বলার অধিকার দিতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে। নানা আন্দোলন ও সংগ্রামের মুখে বারবার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যাচ্ছে, কিন্তু মূল বিষয়গুলো আগের জায়গাতেই স্থবির হয়ে আছে। দুঃখ হলো সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়। দাবি জানাতে হয়।’