সেই চেনা ছক, সেই পরিচিত প্যাটার্ন। ইউসুফ পাঠানকে আর বিনিদ্র রজনী কাটাতে হবে না। সাড়ে ১৪ কাঠারও বেশি জমির ওপর বাড়ি ও বাগান এখন আইনত তাঁর। এ জমি নিয়ে আর কেউ কখনো তাঁকে ঘাঁটাবে না। জমি হাতছাড়া হওয়ার ভয়ও আর রইল না।
সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানের নিস্তরঙ্গ জীবনে হঠাৎই দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ছেয়েছিল ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর লোকসভা আসন থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী হওয়ার পর। গুজরাটের বরোদা শহরে তাঁদের পারিবারিক বাড়ির লাগোয়া যে জমি নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে ঝামেলা চলছিল, সেটি খালি করে দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশ পাঠায় বরোদা পৌরসভা।
সেই থেকে মামলা–মোকদ্দমা নিয়ে জেরবার হচ্ছিলেন পাঠান। অবশেষে আজ তিনি চিন্তামুক্ত। গতকাল শুক্রবার বরোদা পৌরসভার স্ট্যান্ডিং কমিটি সর্বসম্মতভাবে ঠিক করেছে, জবরদখলের অভিযোগ থেকে মুক্ত করে জমিটি পাঠানের হাতেই তুলে দেওয়া হবে।
৪৩ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেটার এই পুরস্কার পেলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছাড়ার পর। লোকসভার যে ২০ জন সংসদ সদস্য তৃণমূলের টিকিটে জিতে এতকাল ধরে মমতার গুণগান গেয়ে বিধানসভা ভোটে দলের ভরাডুবি হওয়া মাত্র রাতারাতি এনসিপিআই নামক এক অজ্ঞাতকুলশীল দলে নাম লেখালেন, ইউসুফ তাঁদেরই একজন।
সুদূর গুজরাট রাজ্য থেকে এসে বহরমপুরের ভূগোল না জেনেও যিনি মমতার কৃপায় ২০২৪ সালের ভোটে জিতে লোকসভার সদস্য হন, দুই বছরের মধ্যে চোখ উল্টে বিজেপির সুরে না নাচলে বরোদা শহরের সাড়ে ১৪ কাঠা জমি (পশ্চিমবঙ্গের মাপ অনুযায়ী) তাঁকে জলাঞ্জলি দিতে হতো।
বরোদা শহরের যে জমি নিয়ে বিতর্ক, তার মাপ ৯৭৮ বর্গমিটার। বরোদা পৌরসভার অভিযোগ, বাড়ির লাগোয়া ওই জমিটি জবরদখল করে ইউসুফ পাঠান তার চারদিকে দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন। ঘটনাটি ২০১২ সালের। ইউসুফের দাবি ছিল, তিনি গুজরাটি। দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলে তিনি (ইউসুফের ভাই ইরফান পাঠানও সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার) দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। বাড়ির লাগোয়া ওই জমিটি নিলাম না করে পৌরসভা তাঁকে ৯৯ বছরের ইজারায় দিক। কেননা, ওই জমি অন্য কারও হাতে গেলে তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
পৌরসভার কাছে যে বছর ওই আবেদন, সেই ২০১২ সালেই দেশের হয়ে ইউসুফের শেষ খেলা। পরের পাঁচ বছর তিনি আইপিএল খেলেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে। বরোদা পৌরসভার কাছে ইউসুফের নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্তিপূর্ণ মনে হয়েছিল। তারা ঠিক করে ইউসুফের প্রস্তাব মেনে ৫৭ হাজার ২৭০ রুপি প্রতি বর্গমিটার হিসাব করে তাঁকে মোট ৫ কোটি ৬০ লাখ রুপি দিতে বলবে। সেই সিদ্ধান্তও পৌরসভা নেয়।
কিন্তু বেঁকে বসে রাজ্য সরকার। নিয়ম অনুযায়ী নিলাম না করে কাউকে জমি দিতে গেলে রাজ্য সরকারের অনুমতি লাগে। রাজ্য সরকার তাই ২০১৪ সালে বরোদা পৌরসভার ওই প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। জমিটি দখল করলেও ইউসুফ তার চারপাশে তখনো দেয়াল তোলেননি। রাজ্য সরকার পৌরসভার প্রস্তাব খারিজ করা মাত্র তিনি জমিতে প্রাচীর তুলে দেন। ব্যবহারও করতে থাকেন।
এরপর ঘটনাপ্রবাহ থিতিয়েই গিয়েছিল। গুজরাট রাজ্য সরকার কিংবা বরোদা পৌরসভা নতুন করে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পাঠানের বিপত্তি শুরু হয় ২০২৪ সালে বহরমপুর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে দাঁড়িয়ে লোকসভার সদস্য হওয়ার পর। মে মাসে তিনি জয়ী হন, জুন মাসে বরোদা পৌরসভা তাঁকে নোটিশ পাঠায় জমি খালি করার।
মোদি–রাজ্য গুজরাটের লোক হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের দলের সদস্য হয়ে লোকসভায় যাওয়া বিজেপি মেনে নিতে পারেনি। ইউসুফ পাঠানও ছাড়ার পাত্র নন। বরোদা পৌরসভার নোটিশের বিরুদ্ধে তিনি গুজরাট হাইকোর্টে মামলা ঠুকে দেন। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সেই মামলায় ইউসুফ হেরে যান। হাইকোর্ট পৌরসভার সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। রায়ের বিরুদ্ধে ইউসুফ আবেদন করেন ডিভিশন বেঞ্চে।
এরপর দ্রুত পটপরিবর্তন ঘটে যায়। বিজেপি কোমর কষে নামে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের জন্য। একদিকে নির্বাচন কমিশনের এসআইআর, অন্যদিকে প্রশাসনিক রদবদল। এই দুইয়ে ভর দিয়ে হিন্দু বাঙালির মমতা–বিদ্বেষে হাওয়া তুলে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটায় বিজেপি। শুরু হয় ‘অপারেশন লোটাস’–এর আরেক অধ্যায়।
সংবিধান সংশোধন বিল পাস করাতে প্রয়োজনীয় দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা পাওয়ার লক্ষ্যে ভাঙা হতে থাকে বিভিন্ন দল। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন লোকসভা সদস্যের দলত্যাগ ওই কারণেই।
সেই দলে না ভিড়ে ইউসুফ পাঠানের উপায় ছিল না। একদিকে বিজেপি–বিরোধী রাজনীতি, অন্যদিকে সাড়ে ১৪ কাঠারও বেশি জমির হাতছানি, নীতি বিসর্জন দিয়ে পাঠান ঢলে যান বিজেপির দিকে। জুন মাসে এনসিপিআইয়ে যোগদানের সিদ্ধান্ত ছিল ‘ডিল’ চূড়ান্ত হওয়ার ছাড়পত্র।
গত ৩১ আগস্ট হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ থেকে মামলা তুলে নেন ইউসুফ পাঠান। বরোদা পৌরসভাও সাবেক ক্রিকেটারকে দখল করা জমি হস্তান্তরের তোড়জোড় শুরু করে দেয়। গত শুক্রবার সেই প্রক্রিয়াতেই সিলমোহর লাগে।
গতকাল শুক্রবার বসেছিল বরোদা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (ভিএমসি) স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক। সেখানেই ৯৭৮ বর্গমিটার জমির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। ঠিক হয় ৫০০ মিটার জমি গুজরাটের এই কৃতী ক্রিকেটারকে পৌরসভা উপহার দেবে। দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর অবদানের জন্য এই স্বীকৃতি। বাকি ৪৭৮ বর্গমিটার জমি দেওয়া হবে কম দামে।
বরোদা নগর উন্নয়ন কমিটির কষা হিসাব থেকে ৪৫ শতাংশ ছাড় দিয়ে ওই জমি পাঠানকে বিক্রি করা হবে। তাঁকে দিতে হবে মাত্র ৫ কোটি ৬০ লাখ রুপি।
বিরোধী দল কংগ্রেস পৌরসভার ওই বৈঠকের বাইরে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ দেখায়। কংগ্রেস নেতারা তুলে ধরেন বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’ তত্ত্ব। বৈঠকে অংশ নেওয়ার অধিকার কংগ্রেসের ছিল না। পৌরসভায় ৬৯ জন সদস্য থাকলেও একটিও স্ট্যান্ডিং কমিটির নেতৃত্বে কংগ্রেস ছিল না। ১২টি কমিটিই বিজেপির দখলে। তাঁদের কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেননি।
রাজ্যে রাজ্যে দলত্যাগী বিরোধী নেতারা বিজেপিতে যোগ দিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত হচ্ছেন। ইডি, সিবিআইয়ের নজর এড়াচ্ছেন। জেলযাত্রার হাত থেকে অব্যাহতি পাচ্ছেন। সেই চেনা ছক, সেই পরিচিত ছকে ইউসুফ পাঠান জবরদখল জমির আইনি অধিকার আদায় করলেন।