ভারতের গুজরাট রাজ্যে এক অভিনব ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। সম্প্রতি জারি করা এক নির্দেশিকার মাধ্যমে সরকার জানিয়েছে, রাজ্যের ৪৬ হাজার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো ‘বহিরাগত’ প্রবেশ করতে পারবেন না। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ুয়াদের মা-বাবা এবং অভিভাবকেরাও অন্তর্ভুক্ত। স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে তাঁদের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শুধুমাত্র প্রবেশাধিকার সীমিত করাই নয়, নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে যে, কোনো বহিরাগত ব্যক্তি স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, দালান এমনকি শৌচাগারের ছবি তুলতে পারবেন না। ভিডিও ধারণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া পড়ুয়া বা শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হবে না কোনো বহিরাগতকে।
কেন এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তার সরকারি ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে, পড়ুয়া, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং গোপনীয়তা রক্ষা করা বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ। পড়ুয়াদের মঙ্গলের দায়িত্ব স্কুল কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত এবং কোনোভাবেই তা বিঘ্নিত হতে দেওয়া যাবে না।
নির্দেশিকায় সতর্ক করা হয়েছে যে, এই নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ‘পকসো’ (প্রটেকশন অব চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেনসেস অ্যাক্ট, ২০১২) আইনসহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, পড়ুয়ারা যখন বিদ্যালয়ে থাকে, কর্তৃপক্ষই তখন তাদের মা–বাবা–অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে।
রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী প্রদ্যুম্ন ওয়াজা গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই নির্দেশিকা জারি করতে হয়েছে ‘অসৎ উদ্দেশ্যের’ লোকজনকে ঠেকাতে। যদিও ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হয়েছে তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গুজরাট সরকার মূলত ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।
ধারণা করা হচ্ছে, বিজেপি সরকার চায় না সিজেপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা সরকারি স্কুলে প্রবেশ করে সেখানকার বেহাল দশা এবং শিক্ষার নিম্নমানের পরিবেশ জনসমক্ষে তুলে ধরুন। আগামী বছর রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন সামনে থাকায় শাসক দল বিজেপির ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গুজরাটে এর আগে কোনো সরকার এমন ধরনের বিধিনিষেধ জারি করেনি।
সিজেপির আন্দোলনের প্রভাবে ইতিপূর্বে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। এরপর সিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি শুরু করে। তাদের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্কুলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছেন। শ্রেণিকক্ষের অবস্থা, চেয়ার-টেবিল-ব্ল্যাকবোর্ডের অভাব, খেলার মাঠের জরাজীর্ণ দশা, শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শিক্ষকের স্বল্পতা ও পানীয় জলের সমস্যা নিয়ে ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। পাশাপাশি পড়ুয়া ও শিক্ষকদের সাক্ষাৎকার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই আন্দোলনের ফলে অনেক রাজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং রাজ্য সরকারগুলো ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানাসহ বহু রাজ্যে পড়ুয়ারা রাস্তায় নেমে দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবেই গুজরাট সরকার চায় না তাদের রাজ্যেও সিজেপি এই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করুক, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে।
সিজেপির এই কর্মসূচির প্রভাবের পর বিজেপিশাসিত বেশ কিছু রাজ্য সতর্ক হয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থান সরকার ইতিমধ্যে নানা কড়াকড়ি করেছে, আর এবার গুজরাট সরকার রাজ্যজুড়ে ঢালাও নির্দেশিকা জারি করল।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি স্কুলে অনুমতিপ্রাপ্ত অতিথিদের নাম, ঠিকানা ও উদ্দেশ্য লিখে প্রবেশ করতে হবে এবং এর জন্য রেজিস্টার খাতা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুজরাট সরকারের প্রাথমিক স্কুল শিক্ষা বিভাগের পরিচালক প্রকাশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, এখন থেকে এই নির্দেশিকা মানা শুধু বাধ্যতামূলকই হলো না, তা আইনি তকমাও পেল।
যদি কেউ অনুমতি ছাড়া সরকারি বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে স্কুল পরিচালনা বা শিক্ষাদানের কাজে বাধা দেয়, কারও সঙ্গে কথা বলে বা ছবি তোলে কিংবা রিল তৈরির চেষ্টা করে, তবে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ দ্রুত স্থানীয় থানা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করবেন এবং আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দলের মুখপাত্র মণীশ দোশি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল অবস্থা লুকাতেই এই নির্দেশ। এভাবে শিক্ষার উন্নতি ঘটানো যায় না। ক্যামেরা নিষিদ্ধ করে সত্য গোপন করাও যায় না।’
দোশি আরও দাবি করেন, গোটা রাজ্যে ৪০ হাজার শিক্ষকপদ শূন্য। ৪২ হাজার স্কুল বাড়ি ভেঙে পড়ার উপক্রম। তিন হাজার স্কুল মাত্র একজন শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ স্কুলে বিভিন্ন শ্রেণির পড়ুয়ারা একসঙ্গে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে। আম আদমি পার্টিও এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছে, সরকারি স্কুলগুলোর অবকাঠামোর করুণ দশা লুকাতেই এই ব্যবস্থা। এই নির্দেশিকাই প্রমাণ করে যে সরকার অনেক কিছু গোপন করতে চাইছে এবং সরকারি স্কুলের প্রকৃত অবস্থা জনসমক্ষে আসতে দিতে নারাজ।