রাত তখন দেড়টা। কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় এলাকায় অবস্থিত টাউন হল মাঠের চারপাশ এখন নিঝুম নীরব। মাসখানেক আগের কথা ভাবলে দেখা যায়, এই জায়গাতেই কিশোর ও তরুণদের বিশাল জটলা লেগে থাকত। প্রকাশ্যে বসত মাদকের আসর। চারদিকে গাঁজার তীব্র গন্ধ আর মোটরসাইকেলের বিকট শব্দে রাতের পরিবেশ ছিল অশান্ত। তবে এখন সেই দৃশ্য পুরোপুরি বদলে গেছে। গভীর রাতেও এখন মানুষ নির্ভয়ে ও স্বস্তিতে চলাচল করতে পারছেন।
টাউন হল মাঠ থেকে কিছুটা দূরে সার্কিট হাউস মোড়ের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ। আগে সন্ধ্যার পর থেকেই মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে কিশোর-তরুণদের মাদকের আড্ডা জমত এবং রাত বাড়ার সাথে সাথে সেই ভিড় আরও বাড়ত। বর্তমানে সেখানে আগের সেই বিশৃঙ্খল পরিবেশ আর চোখে পড়ছে না।
একই চিত্র দেখা গেছে কুমিল্লা রেলস্টেশন এলাকাসহ নগরের বিভিন্ন সড়কে। সাইলেন্সার খুলে বিকট শব্দে মোটরসাইকেল চালিয়ে দল বেঁধে ছোটাছুটি, প্রকাশ্যে মাদকসেবন এবং রাতভর আড্ডার প্রবণতা এখন অনেকটাই কমে এসেছে।
পুলিশি তথ্যানুসারে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক মাসের বিশেষ অভিযানে মোট তিন হাজার ৪১২ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুই হাজার ৩৮৬ জনকে মুচলেকার বিনিময়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি এক হাজার ২৬ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাত ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, এক মাস ধরে চলা ধারাবাহিক কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের ফলে শহরে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। তবে অপরাধ দমনে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং গ্যাংগুলোর নেপথ্যে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি গ্যাংগুলোর মূল পরিকল্পনাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ধারাবাহিক অভিযানের পর রাতের জটলা ও মাদকসেবন অনেকটাই কমেছে। কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের কাছ থেকেও পুলিশ সহযোগিতা পাচ্ছে। তাঁরা বিষয়টিকে পুলিশের দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবে পরিণত করেছেন।”
উল্লেখ্য, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে স্কুলশিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার সানন্দা এলাকায় লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশি তদন্ত এবং গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর মুক্তকণ্ঠতে কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই দিন রাত থেকেই জেলার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান শুরু করে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক মাসের এই অভিযানে তিন হাজার ৪১২ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে দুই হাজার ৩৮৬ জনের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি এক হাজার ২৬ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযানে নগরের আলোচিত কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই তালিকায় ‘আর স্কোয়াড’ বা ‘রতন গ্রুপের’ প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনও রয়েছেন।
চকবাজার এলাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মোশাররফ হোসেনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি বলেন, “আমি ১৫ বছর ধইরা রাইতে গাড়ি চালাই। কয়েকবার পোলাপান আমারে ধইরা সব নিয়া গেছে। মাসখানেক আগেও রাইতে গলির ভিতরে যাইতে ভয় পাইতাম। তয় এহন ভয় লাগে না। খারাপ পোলাপানডি সব জেলের ভিতরে। পুলিশে এই একটা ভালা কাম করছে।”
টাউন হল মাঠের চা-দোকানি এরশাদ মিয়া দুই দশকের বেশি সময় ধরে সেখানে রাতে চা ও সিগারেট বিক্রি করছেন। পরিবর্তনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আগে তো সারা রাইত পোলাপানের ভিড় আছিল। এখন বেচাকেনা কমছে ঠিক; তয় এখন রাইতে বেচাকেনা করতে ভয় লাগে না। গাঁজার গন্ধ পাই না, এইডা ভালো লাগে।”
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান উল্লেখ করেন যে, কিশোর গ্যাংয়ের কারণে বিগত সময়ে কুমিল্লায় ছিনতাই, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের হার বৃদ্ধি পেয়েছিল। তিনি বলেন, বিভিন্ন মামলার এজাহার ও অপরাধের ধরন পর্যালোচনা করে তাঁরা এসব অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। তাদের তৎপরতা বন্ধ করা গেলে কুমিল্লা শহরসহ পুরো জেলার মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আগে থেকেই এমন তৎপরতা দেখাত, তবে গ্যাংগুলো এত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পেত না। তিনি বলেন, আগের তুলনায় গত এক মাসে নগরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমেছে। তিনি আরও বলেন, “এখন এই পরিবর্তন কত দিন থাকে, সেটাই দেখার বিষয়। এটাকে ধরে রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”
একই সুর শোনা গেছে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খানের কণ্ঠে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রশ্রয় কিশোর গ্যাং বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ। রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির কিছু ব্যক্তি নিজেদের পেশিশক্তি বাড়াতে এই গ্যাংগুলোকে ব্যবহার করেন। তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে জানান, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো ‘বড় ভাই’ বা অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যাচাই-বাছাই করে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে। তিনি অভিভাবকদের পরামর্শ দেন যেন সন্ধ্যার পর সন্তানদের গতিবিধির দিকে নজর রাখেন এবং তাদের পড়াশোনায় মনোযোগী করতে সতর্ক থাকেন।
অভিযানের প্রভাব যাচাই করতে মুক্তকণ্ঠ চার রাত ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর, ১২ অক্টোবর, ১৫ অক্টোবর ও ২০ অক্টোবর টাউন হল মাঠ, ঈদগাহ মাঠ এবং রেলস্টেশন এলাকায় আগের মতো কিশোর-তরুণদের জটলা বা মাদকের আসর বসতে দেখা যায়নি।