সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনসচেতনতা তৈরি, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতেন তারা। অথচ অন্যের জন্য নিরাপদ সড়কের বার্তা প্রচার করা সেই তিন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী নিজেই এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মাগুরায় ফেরার পথে ফরিদপুরে একটি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে তাদের মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনায় তাদের সঙ্গে থাকা আরও তিন স্বেচ্ছাসেবী এবং অ্যাম্বুলেন্সচালক আহত হয়েছেন।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে ফরিদপুর-মাগুরা মহাসড়কের মধুখালী উপজেলার আড়কান্দি সেতুসংলগ্ন এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত তিন তরুণের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন— ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের মাগুরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রাব্বি মোল্যা (১৯), সংগঠনটির সদস্য নূর মোহাম্মদ আরিক (২২) ও তামান্না তাবাসসুম ঐশী (২৫)। নিহতরা সবাই মাগুরা পৌর এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, আহত তিন স্বেচ্ছাসেবী সাগর, রিয়া ও জয় বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে জয়ের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। এছাড়া আহত অ্যাম্বুলেন্সচালক মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন আছেন।
সংগঠনটির ফরিদপুর শাখা সূত্রে জানা গেছে, ‘জাগো ফাউন্ডেশন’ পরিচালিত ‘সমতা তারুণ্যের’ প্রকল্পের উদ্যোগে ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার ব্যুরো বাংলাদেশ কার্যালয়ে ডিজিটাল লিটারেসি ও সাইবার বুলিং বিষয়ে একটি অর্ধদিবসের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিল। এই প্রশিক্ষণে বিভিন্ন জেলার সদস্যদের পাশাপাশি মাগুরা শাখার ছয়জন স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেন।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ করে তারা মাগুরায় ফেরার প্রস্তুতি নেন। এরপর ঢাকা থেকে মাগুরাগামী একটি খালি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু আড়কান্দি সেতুর কাছে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে তাদের অ্যাম্বুলেন্সটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, যার ফলে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অ্যাম্বুলেন্সটির সঙ্গে ঢাকাগামী কিং ফিশার পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা ছয় স্বেচ্ছাসেবী ও চালক আহত হন। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তিন স্বেচ্ছাসেবীকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অপর তিন স্বেচ্ছাসেবীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরবর্তীতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নিহত তিনজনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
একই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের ফরিদপুর শাখার সদস্য তুষার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর কণ্ঠে ফুটে ওঠে সহকর্মীদের হারানোর তীব্র বেদনা। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিলাম, দুপুরে নামাজ শেষে ওদের বিদায় দিলাম। কে জানত, এ বিদায় হবে শেষ বিদায়।’
নিহত রাব্বি মোল্যার নিরাপদ সড়কবিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্য সুমাইয়া সাফাত। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘যারা সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য যুদ্ধ করল, আজ তাদেরই জীবন দিতে হচ্ছে!’
ফরিদপুরের করিমপুর হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুস সালাম জানান, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বাস ও অ্যাম্বুলেন্স উদ্ধার করে কানাইপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।