নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সরকারি জমি দখল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে বাধা প্রদান এবং কেটে রাখা গাছ লুটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ আজিজ, স্থানীয় বিএনপি নেতা শরাফত আলী বাচ্চু এবং ইউপি সদস্য মমিনুল হক।

প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, এই অনিয়মের প্রতিবাদ জানালে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. শাহজাহানের উপস্থিতিতেই অভিযুক্তরা হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে সংসদ সদস্যের বিশেষ নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন ওই সরকারি জমিটি পরিমাপ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয়।

স্থানীয় সূত্র এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান জানান, উপজেলার চরজব্বর ইউনিয়নের আবদুল্যাহ মিয়ার হাট এলাকায় পশ্চিম চরজব্বর নেয়াজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেন্টারের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই সময়ে তিনি বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সীমানাপ্রাচীরের পেছনের সরকারি জমিসহ প্রয়োজনীয় অংশে ভবন নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ আজিজ সদলবলে সংসদ সদস্যের সামনে উপস্থিত হয়ে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে তীব্র আপত্তি জানান। এর ফলে সেখানে উত্তেজনা ও বাগ্‌বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংসদ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে মাইকে ঘোষণা দিয়ে পরদিন জমিটি পরিমাপ করার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট জানান, জমিটি সরকারি প্রমাণিত হলে সেখানে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করে বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এই বিষয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, ভবন নির্মাণের সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে থাকা বেশ কিছু গাছ স্থানীয় ভূমি অফিসের অনুমতি নিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি নিজস্ব অর্থায়নে কাটে এবং জমিটি পরিষ্কার করে। এরপর সংসদ সদস্যের নির্দেশে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জমি পরিমাপ করেন। পরিমাপ শেষে দেখা যায়, সেখানে কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি নেই। সীমানার বাইরের ওই অংশটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমি হিসেবে চিহ্নিত হয়, যার একাংশ দখল করে যুবদল নেতা এম এ আজিজ ও বিএনপি নেতা শরাফত আলী বাচ্চু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছিলেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ যে, জমি পরিমাপ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের পরদিন সকালেই যুবদল নেতা এম এ আজিজ, চরজব্বর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শরাফত আলী বাচ্চু ও ইউপি সদস্য মমিনুল হকের নেতৃত্বে কেটে রাখা গাছগুলো লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে সেখানে ভবন নির্মাণ না করার জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা দ্রুত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, খেলার মাঠ ও পরিবেশ রক্ষা এবং উত্তর পাশের সড়ক পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সরকারি জমি ব্যবহার করে সাইক্লোন সেন্টার ভবন নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগের কথা অস্বীকার করে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ আজিজ বলেন, “আমাদের দোকানপাট নিজস্ব খতিয়ানভুক্ত জমিতে অবস্থিত। আমরা দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করছি। এতদিন কেউ আপত্তি করেনি। অথচ এখন আমাদের জমিতেই বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি খালি রয়েছে।”

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে দাবি করে তিনি আরও বলেন, “আমি আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমাকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতেই এসব মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।”

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওসমান এ বিষয়ে জানিয়েছে, সংসদ সদস্যের নির্দেশে জমিটি পরিমাপ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের উত্তর পাশে বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি রয়েছে এবং পরিমাপ শেষে তা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে নির্মিত দোকানগুলোর মালিকদের কাছে বৈধ কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। সঠিক কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে।