স্ত্রী কাকলীকে শেষবার ফোন করে সাহেদ আহম্মেদ আশিক জানিয়েছিলেন, ‘রিয়াদ থেকে পরের ফ্লাইটে জেদ্দা যাবেন। সেখানে পৌঁছে আবার কথা বলবেন।’ স্বামীর সেই ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন কাকলী। কিন্তু আর ফোন আসেনি। সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারানো সাহেদ ফিরেছেন কফিনবন্দী হয়ে। শুক্রবার বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের বাড়িতে তার মরদেহ পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা।
পরিবারের সঙ্গে এক মাস কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরছিলেন ৩৫ বছর বয়সী সাহেদ। দুই বছর পর ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। ছুটি শেষে আবারও প্রবাসজীবনে ফেরার পথে রিয়াদ বিমানবন্দরে তার জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হয়।
শুক্রবার সকালে ঢাকায় সাহেদের মরদেহ গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পরে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা। কফিন বাড়িতে পৌঁছানোর পর শোকের মাতম শুরু হয়। মা, স্ত্রী ও সন্তানদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। স্বজনদের আহাজারিতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি প্রতিবেশীরাও।
পরিবারের সদস্যরা জানান, রিয়াদ বিমানবন্দরে পৌঁছে স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন সাহেদ। পরের ফ্লাইটে জেদ্দা যাওয়ার কথা জানিয়ে সেখানে পৌঁছানোর পর আবার ফোন করবেন বলেছিলেন। কিন্তু এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তারা জানতে পারেন, সাহেদ আর বেঁচে নেই।
গত ১০ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন সাহেদ। পরিবারের সচ্ছলতার জন্য প্রায় দুই বছর আগে সৌদি আরবে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। তার বাবা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই দেশে কর্মরত। ছেলের মৃত্যুর কয়েক দিন আগেই সাহেদের মা ওমরাহ পালন শেষে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছিলেন। সাহেদের মৃত্যুতে স্ত্রী কাকলীর সামনে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
শুক্রবার ঢাকায় মরদেহ গ্রহণের সময় সাহেদের পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেওয়া হয়। তার নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠান বকেয়া বেতন, ভাতা ও চাকরিসংক্রান্ত সুবিধা বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকা বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে অতিরিক্ত আর্থিক ও বিমা সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
সাহেদের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাইফুর রহমান, উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ সময় বগুড়া সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সাহেদের পরিবারের পাশে থাকার পাশাপাশি দুই সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
শুক্রবার বিকেলে বাদ আসর মাদলা গ্রামে সাহেদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কয়েকশ মুসল্লি অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।