জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগের আট মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তের বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। মামলার তদন্তের স্বার্থে আমিরের ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ডিভাইসগুলো চেয়ে বাদীপক্ষকে অন্তত তিনবার চিঠি পাঠিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবি।
ডিভাইসগুলো জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতি নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সেগুলো তদন্ত সংস্থার হাতে জমা দেওয়া হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হ্যাকিংয়ের রহস্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে কখন, কোথা থেকে এবং কীভাবে প্রবেশ করা হয়েছে তা জানা সম্ভব। এছাড়া লগইন বা সেশন সংক্রান্ত তথ্য এবং ম্যালওয়্যার কিংবা ফিশিংয়ের কোনো আলামত আছে কি না, তাও যাচাই করা যেত। ডিভাইস না পাওয়ায় তদন্তের বেশ কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
তবে জামায়াত আমিরের পক্ষে মামলার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, ডিভাইস দিতে তাঁরা অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন না, তবে ডিভাইসের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এই বিষয়ে ডিবির সঙ্গে তাঁদের দুবার আলোচনা হয়েছে এবং নিজেদের উপস্থিতিতে ডিভাইস পরীক্ষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
আদালতের অনুমতি নিয়ে চিঠি
মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর ডিবি-র সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট। তদন্ত কর্মকর্তা বাদী সিরাজুল ইসলামের কাছে ডিভাইস ও অন্যান্য আলামত চেয়ে চিঠি দিয়েছেন এবং তদন্তের স্বার্থে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে বাদীপক্ষের কাছে অন্তত তিনবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো ডিভাইস পাওয়া যায়নি।
সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আদালতের অনুমতি নিয়ে বাদীপক্ষের কাছে অন্তত তিনবার চিঠি দিয়ে ডিভাইস ও তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে বাদীপক্ষ এখনো ডিভাইস দেয়নি।” তবে সর্বশেষ কবে চিঠি দেওয়া হয়েছে বা আদালত ঠিক কবে ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি তিনি।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ এপ্রিল আদালত ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদন মঞ্জুর করেন। আগামী ৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে। ডিভাইসের নিরাপত্তা নিয়ে বাদীপক্ষের উদ্বেগের বিষয়ে কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে এডিসি হাফিজুল ইসলাম বাদীপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
নিজেদের উপস্থিতিতে পরীক্ষা চায় বাদীপক্ষ
মামলার বাদী সিরাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ডিবির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দুবার ডিবির সঙ্গে দেখা করেছি। আমরা ডিভাইস দিচ্ছি না, বিষয়টা এমন নয়। আমরা ডিভাইস ও নিরাপত্তা সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত। এটা নিয়ে আমরা আলাপ করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “তাঁরা তো বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁরা তদন্তে সহযোগিতা না করলে আমার তো এভাবেই ঝুলে থাকতে হবে। আমি সুবিচার চাই। সঠিক তদন্ত হলে আমি সুবিচার পাব। আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এ ঘটনার সঙ্গে।”
ডিভাইস পরীক্ষার বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, “মনে করেন আমরা ডিভাইস দিলাম, সেটার নিরাপত্তা কী? আমরা বলেছি, আমাদের সামনেই চেক করতে হবে। এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
বাদী আরও জানান, মামলা দায়েরের সময় গবেষণায় পাওয়া কিছু কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। সরকারি সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কোনো স্থান থেকে হ্যাকিং হয়ে থাকতে পারে—এমন কিছু তথ্য সংবলিত কাগজও তাঁরা দিয়েছেন।
আসামির ডিভাইস ফেরত, ফরেনসিক প্রতিবেদন আসেনি
বাদীপক্ষের ডিভাইস না পেলেও মামলার অন্যতম আসামি বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমের ব্যবহৃত মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ জব্দ করে তল্লাশি চালিয়েছে ডিবি। ছরওয়ারে আলমের দাবি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত কিছু ডিভাইসও জব্দ করা হয়েছিল, যা প্রায় এক মাস পর ফেরত দেওয়া হয়।
জব্দ করা ডিভাইস থেকে কোনো আলামত পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানান, ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। মামলার শুরুর দিকে এক্স কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও সেখান থেকেও কোনো আপডেট আসেনি। প্রতিবেদনগুলো আসার পরেই এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে।
তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছরওয়ার
এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে পরে জামিন পাওয়া ছরওয়ারে আলম শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তাঁর দাবি, শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। পুলিশ তাঁর ডিভাইস পরীক্ষা করলেও সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে তিনি দাবি করেন, যদিও তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন ফরেনসিক রিপোর্ট এখনো আসেনি।
ছরওয়ারে আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ওদের (জামায়াত) কাছে বারবার পাঠাইছে, মোবাইল চাইছে, চেক করার জন্য চাইছে। ওরা দিচ্ছে না। ওরা যদি ওদের ডিভাইস দিত, তাহলে এত দিনে এটার সমাধান হয়ে যেত।”
তিনি আরও বলেন, “তাঁরা তো বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁরা তদন্তে সহযোগিতা না করলে আমার তো এভাবেই ঝুলে থাকতে হবে। আমি সুবিচার চাই। সঠিক তদন্ত হলে আমি সুবিচার পাব।”
মামলায় জড়িয়ে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়ার পর চাকরিতে ফিরতে না পারায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ছরওয়ারে আলম। তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক মাস বাকি। তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে পেনশনসহ আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। ছরওয়ারে আলমের ভাষ্য, “সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়ে আমি চাকরিতে ফিরতে পারিনি। আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।”
যে পোস্ট ঘিরে মামলা
গত ৩১ জানুয়ারি বিকেলে জামায়াতের আমিরের এক্স হ্যান্ডল থেকে ইংরেজিতে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টের একটি অংশে লেখা হয়, “আমরা বিশ্বাস করি, যখন নারীদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তাঁরা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। এটি অন্য কিছু নয়; বরং পতিতাবৃত্তির অন্য একটি রূপ।”
এই পোস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং রাজপথে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। বিএনপি ও বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে, জামায়াতের আমির কর্মজীবী নারীদের চরম অবমাননা করেছেন।
পরবর্তীতে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারি মেইল ব্যবহার করে আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রথমে সাধারণ ডায়েরি এবং পরে মামলা করা হয়। মামলায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ছরওয়ারকে আটক করে ডিবি এবং তাঁর মুঠোফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। পরদিন তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হলে তিনি আদালত থেকে জামিন পান।
তদন্তে সহযোগিতার তাগিদ
তদন্তে বাদীপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আলামত না পাওয়ার বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি ওমর ফারুক ফারুকী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই সহযোগিতা করা উচিত। এটা বাদী-বিবাদী সবারই দায়িত্ব। তিনি বলেন, “খেয়াল রাখা উচিত, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়।”
হ্যাকিংয়ের অভিযোগের আট মাসের বেশি সময় পার হলেও বাদীপক্ষের ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা হয়নি এবং এক্স কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তথ্য আসেনি। ফলে অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছিল কি না এবং ছরওয়ারে আলমের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—তা এখনো রহস্যজনক রয়ে গেছে।