একটি সুন্দর ও সুখী বৈবাহিক জীবনের মূল লক্ষ্য হলো স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়ামায়া এবং মানসিক প্রশান্তি প্রতিষ্ঠা করা। পবিত্র কোরআন মাজিদের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য সঙ্গী-সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ২১)
ইসলামি জীবনদর্শনে স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক এবং একে অপরের জন্য সুরক্ষাবেষ্টনী হিসেবে কাজ করেন। এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। তবে পরিবারের সামগ্রিক নেতৃত্ব ও প্রধান দায়িত্বভার স্বামীর ওপর ন্যস্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘পুরুষেরা নারীদের প্রতি দায়িত্বশীল বা রক্ষক, যেহেতু আল্লাহ একের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয়ও করে।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৩৪)
শরিয়ত অনুযায়ী স্ত্রীর প্রতি স্বামীর তিনটি মৌলিক দায়িত্ব হলো—খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থান নিশ্চিত করা। এখানে খাদ্য বলতে কেবল কাঁচামাল বা চাল-ডাল-লবণ-তেল কিনে দেওয়াকে বোঝায় না, বরং প্রস্তুত খাবার বোঝায়। তাই স্বামীর সামর্থ্য থাকলে এবং স্ত্রীর চাহিদা অনুযায়ী রান্না করা খাবার পরিবেশন করা স্বামীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
পোশাকের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য; কেবল থানকাপড় কিনে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং পরিধানযোগ্য প্রস্তুত পোশাক নিশ্চিত করতে হবে। পোশাক সেলাই করানো, ধোয়ানো এবং তা ব্যবহারের উপযোগী করে স্ত্রীর জন্য প্রস্তুত রাখা স্বামীর দায়িত্ব। এমনকি খাবারের আগে ও পরে থালাবাসন ধোয়ার কাজ স্ত্রীর বাধ্যতামূলক কর্তব্য নয়; তবে তিনি স্বেচ্ছায় তা করলে নফল ইবাদতের সওয়াব লাভ করবেন।
বাসস্থানের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীকে এমন একটি ঘর বা কক্ষ প্রদান করবেন, যেখানে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামী ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। এই গোপনীয়তার ক্ষেত্রে স্বামীর বাবা-মা বা ভাইবোনও ব্যতিক্রম নন। স্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে তিনি প্রয়োজনে ওই কক্ষের তালাচাবি ব্যবহার করতে পারেন।
স্ত্রীর ব্যক্তিগত বা গোপনীয় বিষয়ে স্বামী ছাড়া অন্য কারো হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই। যদি স্ত্রীর চলাফেরা বা আচার-আচরণ শ্বশুর-শাশুড়ির পছন্দ না হয়, তবে স্বামীর দায়িত্ব হবে স্ত্রীর জন্য আলাদা বাড়ি বা ঘরের ব্যবস্থা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত উমর (রা.)-কে তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ (রা.)-এর স্ত্রীর বিষয়ে অনুরূপ নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, যদি স্বামী অসচ্ছল বা অভাবী হন, তবে স্ত্রী যদি কোনো কাজ করেন, তবে তা স্বামীর উপার্জনে সহায়তা এবং সন্তানদের লালন-পালনে সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হবে। সামগ্রিক পারিবারিক উন্নতির জন্য স্বামী-স্ত্রীর একে অন্যকে সহযোগিতা করা বাঞ্ছনীয়।
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো স্ত্রীর জন্য স্বামীর আত্মীয়স্বজনের সেবা করা বাধ্যতামূলক। প্রকৃতপক্ষে, স্বামীর মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের সেবা করা স্ত্রীর আইনি বা বাধ্যতামূলক কর্তব্য নয়। স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করেন, তবে তিনি নফল ইবাদতের সওয়াব পাবেন, তবে তাঁকে এ কাজে বাধ্য করা যাবে না। বিশেষ করে স্বামীর আত্মীয়স্বজনের সেবা করতে গিয়ে পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা সম্পূর্ণ হারাম। যদি কোনো স্বামী স্ত্রীকে পর্দা লঙ্ঘন করে আত্মীয়স্বজনের সেবায় বাধ্য করেন, তবে তা কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই স্বামী ‘দাইয়ুস’ ও ‘ফাসিক’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। পারিবারিক কাজে স্ত্রীকে সহায়তা করার জন্য সামর্থ্যবান স্বামী একজন নারী ও একজন পুরুষ কর্মী নিয়োগ করতে পারেন—এমন নির্দেশনার কথা ‘শরহে বেকায়া’ কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।
দাম্পত্য সুখ ও জান্নাত লাভের জন্য বিয়ের পর স্ত্রীর অন্যতম প্রধান কর্তব্য হলো স্বামীর বৈধ নির্দেশ পালন করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নারী যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজান মাসে রোজা রাখে, নিজের সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষা করে শালীনতা বজায় রেখে চলে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তখন সে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।’ (আবু দাউদ)
পাশাপাশি স্বামীর সংসারের দেখাশোনা করা এবং তাঁর অর্জিত সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা স্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তবে সৎকর্মশীলা নারী বা সাধ্বী রমণীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালেও তারা তা সংরক্ষণ করেন, যা আল্লাহ হেফাজত করেছেন।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৩৪)
— লেখক: অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি এবং সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।