গত সোমবার সকাল ও দুপুরে কক্সবাজারের ঈদগাঁও–ঈদগড়–বাইশারি সড়কের হিমছড়ি ঢালা এলাকায় দুই দফায় অন্তত ৬০টি যানবাহনে ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় অন্তত সাতজন মারধরে আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের গুরুতর অভিযোগ যে, দীর্ঘ সময় ধরে লুটপাট চললেও সেখানে পুলিশের কোনো টহল ছিল না। দিনের আলোতে একটি পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এত বিপুল সংখ্যক যানবাহনের যাত্রী আক্রান্ত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ কেন টহল দেয়নি এবং খবর পাওয়ার পর কত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—সেই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট জবাব পাওয়া প্রয়োজন।

এই সড়কটির নিরাপত্তাহীনতার ইতিহাস দীর্ঘ। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ এবং জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত ১৭ বছরে এই এলাকায় অন্তত চারজন মানুষ খুন হয়েছেন এবং ৫০টিরও বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ২৩ জন মুক্তিপণ দেওয়ার পর ফিরে এসেছেন। নিহতদের তালিকায় একজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে ফুটিয়ে তোলে।

১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি একাধিক উপজেলা ও দুটি জেলার সীমানার মধ্যে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের মতে, অপরাধ সংঘটিত হলে এক থানা অন্য থানার কথা বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রশাসনিক সীমানার দোহাই দিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্ট জেলা ও থানা কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সড়কের প্রতিটি অংশে নিয়মিত টহল, দ্রুত তথ্য আদান–প্রদান এবং জরুরি সাড়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

পুলিশ জানিয়েছে, সড়কের মাঝামাঝি স্থানে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই উদ্যোগটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল ভবন নির্মাণ করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। সেখানে পর্যাপ্ত জনবল, উপযুক্ত যানবাহন, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত অভিযানের সক্ষমতা থাকতে হবে। পুলিশ ফাঁড়ি চালুর অপেক্ষায় বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শিথিল রাখার সুযোগ নেই; এখনই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত ও আকস্মিক টহল বৃদ্ধি করতে হবে।

পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্যানুযায়ী, এই এলাকার কয়েকটি স্থানে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের আস্তানা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, এই দলগুলো মাদক চোরাচালান, অপহরণ এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও অভিযান চালানো জরুরি। অপরাধীদের অর্থের উৎস, অস্ত্রের জোগান এবং যারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযানের সময় নিরীহ স্থানীয় বাসিন্দারা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পুলিশের দাবি, সর্বশেষ এই লুটপাটের ঘটনায় কেউ অভিযোগ দায়ের করেননি। তবে পুলিশকে এখন ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ গ্রহণ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা প্রদান এবং অপরাধীদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে পুরোনো হত্যা ও অপহরণ মামলাগুলোর বর্তমান অগ্রগতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

নাগরিকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। এই সড়কের ওপর সাধারণ মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভরশীল। দীর্ঘদিনের আবেদন ও আশ্বাসের পর স্থানীয় বাসিন্দারা এখন দৃশ্যমান ফলাফল প্রত্যাশা করছেন। অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের পাশাপাশি দিন-রাত নির্বিঘ্নে চলাচলের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।