প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি কক্সবাজারের ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারি সড়ক। দুই পাশে ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের মাঝখানে পিচঢালাই এই সড়কটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের নাম। দিনের বেলাতেও এখানে চলাচলে ভয় পান পথচারী ও চালকরা, আর সন্ধ্যা নামলেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল।
সচরাচর দেখা যায়, অপরাধীরা সড়কের মাঝখানে গাছের গুঁড়ি ফেলে যানবাহন থামিয়ে দেয়। এরপর অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের নামিয়ে পাশের গভীর জঙ্গলে নিয়ে যায় ডাকাতেরা। সেখানে চলে নির্মম মারধর এবং টাকা ও মুঠোফোন লুট। শুধু লুটপাটই নয়, অনেক ক্ষেত্রে অপহরণ করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এমনকি এই সড়কে খুনের মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে।
কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন দেড় লাখের বেশি মানুষ যাতায়াত করেন। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড়ি জঙ্গলঘেরা এই সড়কের প্রথম সাত কিলোমিটার অংশ ঈদগাঁও উপজেলায়, পরবর্তী পাঁচ কিলোমিটার রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নে এবং শেষ পাঁচ কিলোমিটার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারি ইউনিয়নে পড়েছে।
সম্প্রতি গত সোমবার সকাল ও দুপুরে সড়কের হিমছড়ি ঢালা এলাকায় দুই দফায় অন্তত ৬০টি যানবাহনে ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, যা এই সড়কের চরম নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও সামনে এনেছে। এই ঘটনায় মারধরে অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে লুটপাট চললেও ঘটনাস্থলে পুলিশের কোনো টহল ছিল না।
এ বিষয়ে ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ টি এম সিফাতুল মাজদার বলেন, “দুর্বৃত্তরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে লুটপাটের পর জঙ্গলে আত্মগোপন করেছে। তাদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এ ঘটনায় থানায় কেউ অভিযোগও দেননি।”
সড়কটি একাধিক থানার আওতাভুক্ত হওয়ায় অপরাধ দমনে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের একার পক্ষে এই বিশাল বনাঞ্চলঘেরা এলাকায় ডাকাতি প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে এই সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন থেকেই পাশের পাহাড়ে সন্ত্রাসীরা আস্তানা গড়ে তোলে এবং একের পর এক অপরাধের ঘটনা ঘটতে থাকে। গত ১৭ বছরে এই সড়কে অন্তত চারজন খুন হয়েছেন এবং ৫০টির বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সড়কের প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় ডাকাতি, খুন ও অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটে। সড়কটি দুই থানার আওতায় হওয়ায় অপরাধের ঘটনায় এক থানা অন্য থানার কথা বলে। পুলিশের একার পক্ষে ডাকাতি প্রতিরোধ করাও কঠিন।” তিনি আরও জানান, ঈদগড় ইউনিয়নের দুটি গ্রামে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের আস্তানা রয়েছে। এসব দলের সদস্যরা মাদক চোরাচালান, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, বালু ও কাঠের ব্যবসা এবং মিয়ানমারের মালামাল পাচারে জড়িত।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ বছরে এই সড়কে ঘটা ৫০টির বেশি অপহরণের ঘটনার মধ্যে অন্তত ২৩ জন মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন। খুনের ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর হিমছড়ি ঢালায় ডাকাতের গুলিতে খুন হন আঞ্চলিক গানের শিল্পী জনি দে (১৮) ও দিনমজুর মো. কালু (৩৪)। দুজনের বাড়ি ঈদগড় ইউনিয়নের পূর্ব রাজঘাট গ্রামে। জনি দের বাবা তপন দে জানান, এ ঘটনায় মামলা হলেও তিনি এখনো ছেলের হত্যার বিচার পাননি। এর আগে ২০০৯ সালের ৯ নভেম্বর ডাকাতের গুলিতে খুন হন ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্পের সদস্য নায়েক সুশময় চাকমা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাইশারি এলাকায় গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় কাঠ ব্যবসায়ী জাফর আলমকে।
অপহরণের এক করুণ অভিজ্ঞতা মাওলানা মিজানুর রহমানের। গত বছরের ২৫ মার্চ রাতে ঈদগড় থেকে ঈদগাঁও যাওয়ার পথে তিনি অপহরণের শিকার হন। তিনি ঈদগড়ের জঙ্গলকাটা মসজিদের ইমাম। অপহরণকারীরা তাঁকে পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রেখে মারধর করে এবং পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরদিন দুই লাখ টাকা পরিশোধ করে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করেন।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের মতে, সড়কের দুই পাশে পাহাড় ও গভীর বনাঞ্চল থাকায় অপরাধীরা খুব সহজেই পালিয়ে যেতে পারে। সরু, আঁকাবাঁকা এবং জনবসতিহীন এই সড়কে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে কোনো স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি না থাকায় অপরাধীদের তৎপরতা দমন করা যাচ্ছে না।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মাহমুদুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সড়কের গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও ঈদগড় এলাকায় কয়েকটি ডাকাত দলের আস্তানা রয়েছে। এসব দলের সদস্যরা মাদক চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত। কিছু ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তারা আবার সড়কে ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও জানান, সড়কের মাঝখানে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের জন্য তিন মাস আগে সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল, যার অনুমোদন পাওয়া গেছে। খুব শিগগিরই সেখানে কাজ শুরু হবে।
অন্যদিকে, ঈদগড় বাজার কমিটির সভাপতি নুরুল হুদা বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি ও অপহরণ বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর তল্লাশিচৌকি স্থাপনের দাবিও জানানো হয়েছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”