মেয়াদ শেষ হতে এখনও দুই থেকে পাঁচ বছর বাকি থাকা সত্ত্বেও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রী নগরের শম্ভুগঞ্জের একটি বর্জ্য সংরক্ষণাগারে পাওয়া যাচ্ছে। বর্জ্য বাছাইয়ের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিন হাসপাতালের বর্জ্যের সঙ্গে এসব সামগ্রী সেখানে পৌঁছায়। এর মধ্যে কিছু সামগ্রী পুনরায় হাসপাতালে ফেরত পাঠানো হয় এবং বাকিগুলো পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়। হাসপাতালের অভ্যন্তর থেকে এই সামগ্রীগুলো কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলো মমেক হাসপাতাল। প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য ভিড় করেন। একদিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে মেয়াদ থাকা সামগ্রী বর্জ্যের সঙ্গে বাইরে চলে যাওয়ার এই ঘটনা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে হাসপাতালের মজুত ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং জবাবদিহিতার বিষয়টি এখন প্রশ্নের মুখে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শম্ভুগঞ্জের ওই বর্জ্য সংরক্ষণাগারে কয়েক বস্তা সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া গেছে। এসব সামগ্রীর গায়ে লেখা মেয়াদ অনুযায়ী, কিছু ২০২৮ সাল পর্যন্ত এবং কিছু ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য। মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও কেন এগুলো বর্জ্যের সঙ্গে হাসপাতালের বাইরে যাচ্ছে, তা নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে।
বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইয়ের কাজে যুক্ত শ্রমিক জুবেদা খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কাজে মোট ১১ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন সরাসরি মমেক হাসপাতাল থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন এবং বাকি সাতজন শম্ভুগঞ্জের সংরক্ষণাগারে সেগুলো বাছাই করার কাজ করেন।
জুবেদা খাতুন বলেন, “প্রতিদিন বর্জ্যের সঙ্গে নতুন সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন আসে। এসব সামগ্রী আলাদা বস্তায় রাখা হয়। ১০ থেকে ১২ দিন পর তিন থেকে চার বস্তা জমলে সেগুলো হাসপাতালে ফেরত দেওয়া হয়।” তিনি আরও দাবি করেন যে, অবশিষ্ট সামগ্রীগুলো পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন মমেক হাসপাতাল থেকে ৩৫ থেকে ৪০ ভ্যানগাড়ি বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া হয়। এই বর্জ্যের মধ্য থেকে প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে কয়েক বস্তা অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া যায় বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
হাসপাতালের মজুত থেকে ওয়ার্ডে সরবরাহ, অব্যবহৃত সামগ্রী ফেরত নেওয়া এবং বর্জ্য হিসেবে নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপে সঠিক হিসাব রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্জ্যের সঙ্গে ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে যাওয়ার অভিযোগের পর, এই ধাপগুলোতে তদারকি ও হিসাব সংরক্ষণের ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
নগরের ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী বর্জ্যের সঙ্গে বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। কোনো অনিয়ম থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নিতে হবে।”
নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, “হাসপাতালের অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দায় ও তদারকির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
এই বিষয়ে ঠিকাদার আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে তিনি সেটি দেখলেও কোনো উত্তর দেননি।
তবে হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর কর্মকর্তা ডা. ঝন্টু সরকার বলেন, “অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ চিকিৎসাসামগ্রী হাসপাতালের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ছুটি শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডেকে এ বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়া হবে। হাসপাতালের বাইরে এসব সামগ্রী কীভাবে যাচ্ছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”